ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের জবানবন্দি

গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক। সাক্ষ্যতে তিনি বরিশালের পাথরঘাটায় এক অভিযানে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদস্য নজরুলসহ কয়েকজনকে হত্যা করে বস্তায় বেঁধে পেট কটে লাশ নদীতে ফেলার বর্ণনা তুলে ধরেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান ও নাজনীন আহসান।
বেলা সাড়ে ১০টার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য প্রদান করেন। অপরদিকে আসামি জিয়াউল আহসান এজলাস কক্ষের কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দি শোনেন ও নোট করেন।
জবানবন্দির শুরুতে বাহিনীতে নিজের যোগদানের বর্ণনা তুলে ধরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৬২ বৎসর। বর্তমানে আমি অবসরে আছি। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে ১৯৯০ সালের ২২শে জুন লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন্ড প্রাপ্ত হই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক অবসরে যাই। চাকরিকালীন সময়ের মধ্যে আমি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালের অধিনায়ক হিসেবে প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম।
জিয়াউল আহসান ও ডাইরেক্টররা নির্দেশনা দিতেন
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি অধিনায়ক থাকাকালীন সময় আমার সঙ্গে উপঅধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর কুতুব এবং মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। আমার চাকরিকালীন সময়ে র্যাব সদর দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে খন্দকার হাসান মাহমুদ এবং মোখলেছুর রহমানকে পেয়েছি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) হিসেবে তৎকালীন কর্নেল গুলজার, কর্নেল রেজা নুর, কর্নেল মিজান, কর্নেল এস এম মতিউর রহমান, কর্নেল জাহাঙ্গীর এবং কর্নেল মজিবুর রহমান কর্মরত ছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে প্রতি মাসে র্যাব সদর দপ্তরে সিও’স কনফারেন্সে আমাকে যোগ দিতে হতো। সেই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করতেন র্যাবের মহাপরিচালক। সেখানে র্যাবের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। সেই কনফারেন্সে র্যাবের অপারেশন এবং প্রশাসনিক বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সেখানেই র্যাব সদরদপ্তরের সব শাখা প্রধানদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যার মধ্যে ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান, মিডিয়া উইংয়ের ডাইরেক্টর কমান্ডার সোহায়েলসহ অন্যান্য সকল পরিচালক বা ডাইরেক্টররা দিক-নির্দেশনা দিতেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই অধিনায়ক সম্মেলনে যেহেতু দিক নির্দেশনা বা গাইডলাইন দেওয়া হতো তার প্রেক্ষিতে র্যাব ব্যাটালিয়নের অধিনায়করা তাদের নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় দাগী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং তাদেরকে আইনের আওতায় সোপর্দ করার বিষয়ে দিক নির্দেশনা চাইতো। এর প্রেক্ষিতে অধিনায়কদের কাছ থেকে এই মর্মে নির্দেশনা চাওয়া হতো যে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়তো, এক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতেন ধৃত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাবে যোগদান করার পর জানতে পারি র্যাবের কর্মপরিধি হলো সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যান্য কাজের সাথে আমরা দেশব্যাপি টহল ডিউটি সম্পাদন করতাম। সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে যখন কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের জন্য যাওয়া হতো তখন অবশ্যই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোথাও অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান বা মাদক চোরাচালানের ম্যাসেজ আমরা পেতাম তখন গোপনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো।
গোপনীয়তার সাথে এসব অভিযান পরিচালনার সময় টার্গেট এরিয়াতে যদি টার্গেটেড সন্ত্রাসীর মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটতো। আর যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না হতো সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অপারেশন বা অভিযান সফল হতো।
র্যাব-৮ এর আওতায় ছিল ১১টি জেলা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাব-৮ এর আওতায় ১১টি জেলা ছিল। যার প্রায় সবগুলো নদী বিধৌত এবং উপকূলীয়। সুন্দরবনসহ এসব উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতির তৎপরতা ছিল অতিমাত্রায়। তাছাড়া রাজবাড়ী জেলার দিকে সন্ত্রাসী তৎপরতাও ছিল। তার সাথে চরমপন্থি তৎপরতাও ছিল। সুন্দরবনের কিছু এলাকা র্যাব-৮ এর দায়িত্বে এবং কিছু এলাকা র্যাব-৬ এর দায়িত্বে ছিল। সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু দমনের জন্য টহল বা অপারেশন পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন সময়ে ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং তাদের সক্ষমতার কারণে ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতো। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ এবং গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার শংকায় ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্যসহ অপারেশন পরিচালনা করতো। এসব অপরাশেন যেকোন ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাতেই পরিচালনা করা হতো। বরিশাল অঞ্চলে এরকম বেশকিছু সংখ্যক অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের অন্যান্য অফিসার ও সাধারণ সদস্যসহ আসতেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, লে. কর্নেল জিয়ার বাড়ি বরিশালে। সে হিসেবে তিনি বরিশালে তার বাড়িতে এলে আমাদের ব্যাটালিয়নে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আসতেন। তাছাড়া বিভিন্ন অফিসিয়াল ভিজিটে যেমন, মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট হলেও লে. কর্নেল জিয়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
ভোলার অপারেশনে টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সঙ্গে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরও অন্যান্য অফিসার যখন বরিশালে এসে অপারেশন পরিচালনা করতো তখন র্যাব-৮ এর কাছ থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতো। এসব প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে ছিল তাদের জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা, ভারী বস্তার ব্যবস্থা করা, পাথরঘাটাতে বোট ঠিক করে রাখা ইত্যাদি। এরকম অন্তত তিনটা অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে। যার একটি ভোলাতে এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়।
ব্রি. জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, ভোলার অপারেশনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে আমার এবং আমার উপ-অধিনায়ক মেজর সাব্বিরকে যেতে হয়েছিল। সেখানে সফলতা হিসেবে অপারেশন শেষে দুজন ডাকাত বা সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়, সেই সাথে কিছু অস্ত্র। পরবর্তীতে পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর ঐ মৃতদেহগুলোকে ভোলার সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং জিয়ার নেতৃত্বে ভোলাতে ফেরত আসে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমি যা দেখেছি তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে পুরো ঘটনাটি সাজানো অর্থাৎ ঐ সন্ত্রাসী বা ডাকাত দুজনকে আগে থেকেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দুটি স্থির আলোকচিত্র আমি ট্রাইবুনালে দাখিল করলাম।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই সেই দুটি আলোকচিত্র। এই দুটো ছবিতে আমি, জিয়াউল আহসান, তার রানার ইমরুল, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরেকজন অফিসার, জিয়ার পিছনে এএসপি মাহমুদকে দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনের অন্য দুটি অপারেশনের একটি ছিল কুখ্যাত রাজু ডাকাত ধরার জন্য পরিচালিত। যেখানে র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল মুজিব, মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহায়েলসহ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক সাংবাদিক ছিলেন। ঐ অভিযানে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানও ছিলেন। এই অপারেশনের বিষয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়াতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছিল এবং ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। যদিও এটি রাজু ডাকাতকে ধরার পরিকল্পিত অপারেশন ছিল তবে রাজু ডাকাতকে সেখানে পাওয়া যায়নি, বরং ২ থেকে ৩টি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এই অপারেশনটিও যথাযথ পুলিশি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। সুন্দরবনের অপর অপারেশনটি ছিল নিশানখালি এলাকায়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক অপারেশন। এই অপারেশনেও ইতোপূর্বে বর্ণিত অফিসারবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন এবং এটিও ছিল একটি যৌথ অপারেশন। এখানেও ২ থেকে ৩টি মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। উল্লেখিত দুটি অপারেশনের ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এ দুটি ক্ষেত্রেও আমার কাছে মনে হয়েছে টার্গেট এলাকায় মৃত ডাকাতদের আগে থেকেই গুলি করে মারা হয়েছে।
র্যাবে ‘এলিমিনেশন বা গলফ’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি আগেই বলেছি যেহেতু বরিশাল অঞ্চলটি উপকূলীয় এবং ওখানকার নদীগুলো জোয়ার ভাটায় পরিপূর্ণ, এটাকে ব্যবহার করে আরও একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যার কথা আমার মনে আছে। অপারেশনটি সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের। ওই দিন লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের বেশ কয়েকজন অফিসারসহ, যার মধ্যে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট সাইফও ছিল, তাকে আমার বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ হলো তার বিশেষ ধরণের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি এবং লম্বা চুল ছিল। ওই দিন রাতের প্রথম অংশে ২-৩টি মাইক্রোবাস আমাদের ব্যাটালিয়নে প্রবেশ করে, যার নেতৃত্বে ছিল ইন্টেলিজেন্স উইং। পরবর্তীতে আমার ব্যাটালিয়নের অফিসার আমাকে জানায় যে, ঐ মাইক্রোবাসে ৩ থেকে ৪টি সাবজেক্ট আছে। সাবজেক্ট বলতে চোখ ও হাত বাঁধা সাধারণ মানুষ বুঝিয়েছি। আমাকে আরও জানানো হয়, এই মাইক্রোবাসগুলোসহ ইন্টেলিজেন্স উইং পাথরঘাটা এলাকায় যাবে এবং এর জন্য প্রশাসনিক সহায়তা হিসেবে পাথরঘাটায় বোট রেডি করা, পথে নির্বিঘ্নে ফেরিঘাট পার হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। হায়ার হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটালিয়নের এসব নিশ্চিত করতে হতো। যেহেতু ঊর্ধ্বতন দপ্তরের নির্দেশনা মানার বিষয়ে কোনো ধরনের অপারগতা প্রকাশের সুযোগ ছিল না, তাই এসব কাজ ব্যাটালিয়নের করতে হতো। ঠিক একইভাবে এই অভিযানে আমাকে এবং আমার উপ-অধিনায়ককেও তাদের সাথে যেতে হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, মধ্যরাতের পর পাথরঘাটার উদ্দেশে রওনা দিয়ে সেখানে পৌঁছার পর আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বোটে মাইক্রোবাসে থাকা হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিদেরকে উঠানো হয়। তাদেরকে উঠানো হয়ে গেলে লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সাথে আসা অফিসাররাসহ আমি ও মেজর সাব্বির নৌকায় উঠি এবং নৌকার ছাদের উপর গিয়ে বসি। তারপর নৌকা বা বোট পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ঐ দিন আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে না থাকায় মোহনার দিকে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় বোট মোহনার দিকে চলার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। ঐ সময় বোটের ছাদ থেকে লে. কর্নেল জিয়া, ফ্লাইট লে. সাইফ, মেজর সাব্বিরসহ অন্যান্য অফিসাররা নেমে যায়। আমি ছাদের উপরেই ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি বোটের ছাদের সামনের দিকে এসে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করি ওখানে কি হচ্ছে। আমি দেখতে পাই, চোখ-হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সাথে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছিল। বাঁধা হয়ে গেলে একজন ঐ চোখ ও হাত বাঁধা লোককে গুলি করে এবং প্রায় সাথেসাথেই অন্য একজন গুলিবিদ্ধ লোকের পেট ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে। এর পরপরই ঐ গুলিবিদ্ধ লোককে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব দেখে আমি আবার ছাদের পিছন দিকে চলে আসি। সেখানে থেকে আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আরও ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং পানিতে আগের মতোই গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পাই। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথম গুলিবিদ্ধ দেহটি ফেলে দেওয়ার পর বোট খুব ধীর গতিতে একটু একটু করে এগোচ্ছিল। অর্থাৎ পরবর্তী গুলিবিদ্ধ দেহগুলোকে কিছুটা দূরে দূরে ফেলা হয়েছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল। তারপর বোট ঘুরিয়ে আবার পাথরঘাটায় ফেরত আসি এবং সেখানে থেকে যাওয়া গাড়িগুলোসহ আমি এবং মেজর সাব্বির আমাদের ব্যাটালিয়নে ফেরত আসি আর লে. কর্নেল জিয়াসহ তার দল তাদের গন্তব্যে চলে যায়। এরকম যে অভিযান পরিচালিত হলো, এটাকে র্যাবের ভাষায় ‘এলিমিনেশন বা গলফ’ বলা হতো। অর্থাৎ আমার কাছে মনে হয়েছে ধৃত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ট্রেস যেন না থাকে সেই জন্য তাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় এলিমিনেট করে দেওয়া হয়েছে।
লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই ঘটনার প্রায় ২ থেকে ৪ দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মৃতদেহ নদীতে ভেসে ওঠে, এক্ষেত্রে ওই এলাকার স্থানীয় থানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই লাশ ভেসে ওঠার খবর এবং এ ব্যাপারে আরও কী তথ্য পাওয়া যায় তা জানার জন্য র্যাব সদর দপ্তরের ইন্ট. উইং থেকে লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন। মেজর সাব্বির তখন ব্যাটালিয়নের নিজস্ব গোয়েন্দা এবং ওখানকার স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় যথাসম্ভব খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঐ ভেসে উঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ঐ মৃতদেহটির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে ঐ লাশটি নজরুলের। এরকম পরিস্থিতিতে আমার কাছেও মনে হয়েছে, ২ থেকে ৪ দিন আগে পাথরঘাটায় গিয়ে যে তথাকথিত গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেটি একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যা ওই ৩-৪ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যার একজন ছিলেন নজরুল। সার্বিকভাবে বলতে চাই যে, ঊর্ধ্বতন দপ্তর হিসেবে ইন্ট. উইং কমান্ড চ্যানেল ব্রেক করে প্রায়শই ব্যাটালিয়নের তার নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের জনবল এবং ব্যাটালিয়নের অফিসারদেরকে বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দেশ দিতেন, যা আমার অপছন্দনীয় ছিল।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি এখানে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি সেগুলোর জন্য বোট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একটি বোটের মূল মাঝিসহ আরও প্রায় ২-৩ জন সহকারী থাকতো। যেহেতু বোটে করে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হতো আবার তাদেরই লাশ ফেরত আনা হতো সেক্ষেত্রে একটা বিশেষ নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনাটি হলো, একই সোর্স বা সাহায্যকারীকে লম্বা সময় ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনাটি বিশেষ করে অধিনায়ক সম্মেলনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া বলতেন। এই প্রসঙ্গে বলি, বরিশালে এসে বোট ব্যবহার করে যে অভিযানগুলো ইন্টেলিজেন্স উইং করেছিল সেখানে একজন মাঝির বোট অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছিল। ঐ মাঝির নাম ছিল আলকাস। এই আলকাস মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল জানিয়ে লে. কর্নেল জিয়া মেজর সাব্বিরকে অবহিত করেন। যেহেতু ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাদের এ সংক্রান্তে সরঞ্জামাদি যথেষ্ট ছিল তাই পাথরঘাটা তথা আলকাস মাঝির অবস্থান এলাকায় যেসব গোপন খবর প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিল তা ইন্টেলিজেন্স উইং খুব দ্রুতই সংগ্রহ করতে পারতো। এরপর বেশ কিছুদিন আর আলকাস মাঝির বোট ব্যবহার করা হয়নি। তবে এক সময় লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন যে, আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে হবে, আর তুমি এটা করবে। এরপর মেজর সাব্বির আমাকে জানায় যে, সে লে. কর্নেল জিয়ার কাছ থেকে আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করার যে নির্দেশ পেয়েছিল সেটি সে পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এই ঘটনার কয়েকদিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আসে এবং জানায় যে, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা র্যাব-৮ হিসেবে তার কোনো খবর জানি কি না। আমরা ঐ পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেই এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু সাহায্য সহযোগিতাও করি। আলকাস মাঝির এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে আমার নিশ্চিত সন্দেহ হয়েছে যে, যেহেতু মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবার এই মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে তাই তাকে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বেই নিখোঁজ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এ পর্যন্ত আমি আমার বক্তব্যে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি তার সবগুলোই অযাচিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা অন্যায়ভাবে করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি। সূত্র: এনটিভি
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের জবানবন্দি
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের জবানবন্দি

গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক। সাক্ষ্যতে তিনি বরিশালের পাথরঘাটায় এক অভিযানে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদস্য নজরুলসহ কয়েকজনকে হত্যা করে বস্তায় বেঁধে পেট কটে লাশ নদীতে ফেলার বর্ণনা তুলে ধরেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান ও নাজনীন আহসান।
বেলা সাড়ে ১০টার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য প্রদান করেন। অপরদিকে আসামি জিয়াউল আহসান এজলাস কক্ষের কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দি শোনেন ও নোট করেন।
জবানবন্দির শুরুতে বাহিনীতে নিজের যোগদানের বর্ণনা তুলে ধরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৬২ বৎসর। বর্তমানে আমি অবসরে আছি। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে ১৯৯০ সালের ২২শে জুন লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন্ড প্রাপ্ত হই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক অবসরে যাই। চাকরিকালীন সময়ের মধ্যে আমি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালের অধিনায়ক হিসেবে প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম।
জিয়াউল আহসান ও ডাইরেক্টররা নির্দেশনা দিতেন
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি অধিনায়ক থাকাকালীন সময় আমার সঙ্গে উপঅধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর কুতুব এবং মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। আমার চাকরিকালীন সময়ে র্যাব সদর দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে খন্দকার হাসান মাহমুদ এবং মোখলেছুর রহমানকে পেয়েছি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) হিসেবে তৎকালীন কর্নেল গুলজার, কর্নেল রেজা নুর, কর্নেল মিজান, কর্নেল এস এম মতিউর রহমান, কর্নেল জাহাঙ্গীর এবং কর্নেল মজিবুর রহমান কর্মরত ছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে প্রতি মাসে র্যাব সদর দপ্তরে সিও’স কনফারেন্সে আমাকে যোগ দিতে হতো। সেই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করতেন র্যাবের মহাপরিচালক। সেখানে র্যাবের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। সেই কনফারেন্সে র্যাবের অপারেশন এবং প্রশাসনিক বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সেখানেই র্যাব সদরদপ্তরের সব শাখা প্রধানদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যার মধ্যে ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান, মিডিয়া উইংয়ের ডাইরেক্টর কমান্ডার সোহায়েলসহ অন্যান্য সকল পরিচালক বা ডাইরেক্টররা দিক-নির্দেশনা দিতেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই অধিনায়ক সম্মেলনে যেহেতু দিক নির্দেশনা বা গাইডলাইন দেওয়া হতো তার প্রেক্ষিতে র্যাব ব্যাটালিয়নের অধিনায়করা তাদের নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় দাগী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং তাদেরকে আইনের আওতায় সোপর্দ করার বিষয়ে দিক নির্দেশনা চাইতো। এর প্রেক্ষিতে অধিনায়কদের কাছ থেকে এই মর্মে নির্দেশনা চাওয়া হতো যে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়তো, এক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতেন ধৃত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাবে যোগদান করার পর জানতে পারি র্যাবের কর্মপরিধি হলো সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যান্য কাজের সাথে আমরা দেশব্যাপি টহল ডিউটি সম্পাদন করতাম। সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে যখন কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের জন্য যাওয়া হতো তখন অবশ্যই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোথাও অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান বা মাদক চোরাচালানের ম্যাসেজ আমরা পেতাম তখন গোপনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো।
গোপনীয়তার সাথে এসব অভিযান পরিচালনার সময় টার্গেট এরিয়াতে যদি টার্গেটেড সন্ত্রাসীর মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটতো। আর যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না হতো সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অপারেশন বা অভিযান সফল হতো।
র্যাব-৮ এর আওতায় ছিল ১১টি জেলা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাব-৮ এর আওতায় ১১টি জেলা ছিল। যার প্রায় সবগুলো নদী বিধৌত এবং উপকূলীয়। সুন্দরবনসহ এসব উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতির তৎপরতা ছিল অতিমাত্রায়। তাছাড়া রাজবাড়ী জেলার দিকে সন্ত্রাসী তৎপরতাও ছিল। তার সাথে চরমপন্থি তৎপরতাও ছিল। সুন্দরবনের কিছু এলাকা র্যাব-৮ এর দায়িত্বে এবং কিছু এলাকা র্যাব-৬ এর দায়িত্বে ছিল। সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু দমনের জন্য টহল বা অপারেশন পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন সময়ে ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং তাদের সক্ষমতার কারণে ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতো। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ এবং গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার শংকায় ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্যসহ অপারেশন পরিচালনা করতো। এসব অপরাশেন যেকোন ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাতেই পরিচালনা করা হতো। বরিশাল অঞ্চলে এরকম বেশকিছু সংখ্যক অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের অন্যান্য অফিসার ও সাধারণ সদস্যসহ আসতেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, লে. কর্নেল জিয়ার বাড়ি বরিশালে। সে হিসেবে তিনি বরিশালে তার বাড়িতে এলে আমাদের ব্যাটালিয়নে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আসতেন। তাছাড়া বিভিন্ন অফিসিয়াল ভিজিটে যেমন, মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট হলেও লে. কর্নেল জিয়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
ভোলার অপারেশনে টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সঙ্গে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরও অন্যান্য অফিসার যখন বরিশালে এসে অপারেশন পরিচালনা করতো তখন র্যাব-৮ এর কাছ থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতো। এসব প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে ছিল তাদের জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা, ভারী বস্তার ব্যবস্থা করা, পাথরঘাটাতে বোট ঠিক করে রাখা ইত্যাদি। এরকম অন্তত তিনটা অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে। যার একটি ভোলাতে এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়।
ব্রি. জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, ভোলার অপারেশনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে আমার এবং আমার উপ-অধিনায়ক মেজর সাব্বিরকে যেতে হয়েছিল। সেখানে সফলতা হিসেবে অপারেশন শেষে দুজন ডাকাত বা সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়, সেই সাথে কিছু অস্ত্র। পরবর্তীতে পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর ঐ মৃতদেহগুলোকে ভোলার সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং জিয়ার নেতৃত্বে ভোলাতে ফেরত আসে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমি যা দেখেছি তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে পুরো ঘটনাটি সাজানো অর্থাৎ ঐ সন্ত্রাসী বা ডাকাত দুজনকে আগে থেকেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দুটি স্থির আলোকচিত্র আমি ট্রাইবুনালে দাখিল করলাম।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই সেই দুটি আলোকচিত্র। এই দুটো ছবিতে আমি, জিয়াউল আহসান, তার রানার ইমরুল, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরেকজন অফিসার, জিয়ার পিছনে এএসপি মাহমুদকে দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনের অন্য দুটি অপারেশনের একটি ছিল কুখ্যাত রাজু ডাকাত ধরার জন্য পরিচালিত। যেখানে র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল মুজিব, মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহায়েলসহ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক সাংবাদিক ছিলেন। ঐ অভিযানে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানও ছিলেন। এই অপারেশনের বিষয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়াতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছিল এবং ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। যদিও এটি রাজু ডাকাতকে ধরার পরিকল্পিত অপারেশন ছিল তবে রাজু ডাকাতকে সেখানে পাওয়া যায়নি, বরং ২ থেকে ৩টি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এই অপারেশনটিও যথাযথ পুলিশি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। সুন্দরবনের অপর অপারেশনটি ছিল নিশানখালি এলাকায়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক অপারেশন। এই অপারেশনেও ইতোপূর্বে বর্ণিত অফিসারবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন এবং এটিও ছিল একটি যৌথ অপারেশন। এখানেও ২ থেকে ৩টি মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। উল্লেখিত দুটি অপারেশনের ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এ দুটি ক্ষেত্রেও আমার কাছে মনে হয়েছে টার্গেট এলাকায় মৃত ডাকাতদের আগে থেকেই গুলি করে মারা হয়েছে।
র্যাবে ‘এলিমিনেশন বা গলফ’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি আগেই বলেছি যেহেতু বরিশাল অঞ্চলটি উপকূলীয় এবং ওখানকার নদীগুলো জোয়ার ভাটায় পরিপূর্ণ, এটাকে ব্যবহার করে আরও একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যার কথা আমার মনে আছে। অপারেশনটি সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের। ওই দিন লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের বেশ কয়েকজন অফিসারসহ, যার মধ্যে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট সাইফও ছিল, তাকে আমার বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ হলো তার বিশেষ ধরণের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি এবং লম্বা চুল ছিল। ওই দিন রাতের প্রথম অংশে ২-৩টি মাইক্রোবাস আমাদের ব্যাটালিয়নে প্রবেশ করে, যার নেতৃত্বে ছিল ইন্টেলিজেন্স উইং। পরবর্তীতে আমার ব্যাটালিয়নের অফিসার আমাকে জানায় যে, ঐ মাইক্রোবাসে ৩ থেকে ৪টি সাবজেক্ট আছে। সাবজেক্ট বলতে চোখ ও হাত বাঁধা সাধারণ মানুষ বুঝিয়েছি। আমাকে আরও জানানো হয়, এই মাইক্রোবাসগুলোসহ ইন্টেলিজেন্স উইং পাথরঘাটা এলাকায় যাবে এবং এর জন্য প্রশাসনিক সহায়তা হিসেবে পাথরঘাটায় বোট রেডি করা, পথে নির্বিঘ্নে ফেরিঘাট পার হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। হায়ার হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটালিয়নের এসব নিশ্চিত করতে হতো। যেহেতু ঊর্ধ্বতন দপ্তরের নির্দেশনা মানার বিষয়ে কোনো ধরনের অপারগতা প্রকাশের সুযোগ ছিল না, তাই এসব কাজ ব্যাটালিয়নের করতে হতো। ঠিক একইভাবে এই অভিযানে আমাকে এবং আমার উপ-অধিনায়ককেও তাদের সাথে যেতে হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, মধ্যরাতের পর পাথরঘাটার উদ্দেশে রওনা দিয়ে সেখানে পৌঁছার পর আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বোটে মাইক্রোবাসে থাকা হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিদেরকে উঠানো হয়। তাদেরকে উঠানো হয়ে গেলে লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সাথে আসা অফিসাররাসহ আমি ও মেজর সাব্বির নৌকায় উঠি এবং নৌকার ছাদের উপর গিয়ে বসি। তারপর নৌকা বা বোট পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ঐ দিন আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে না থাকায় মোহনার দিকে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় বোট মোহনার দিকে চলার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। ঐ সময় বোটের ছাদ থেকে লে. কর্নেল জিয়া, ফ্লাইট লে. সাইফ, মেজর সাব্বিরসহ অন্যান্য অফিসাররা নেমে যায়। আমি ছাদের উপরেই ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি বোটের ছাদের সামনের দিকে এসে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করি ওখানে কি হচ্ছে। আমি দেখতে পাই, চোখ-হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সাথে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছিল। বাঁধা হয়ে গেলে একজন ঐ চোখ ও হাত বাঁধা লোককে গুলি করে এবং প্রায় সাথেসাথেই অন্য একজন গুলিবিদ্ধ লোকের পেট ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে। এর পরপরই ঐ গুলিবিদ্ধ লোককে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব দেখে আমি আবার ছাদের পিছন দিকে চলে আসি। সেখানে থেকে আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আরও ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং পানিতে আগের মতোই গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পাই। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথম গুলিবিদ্ধ দেহটি ফেলে দেওয়ার পর বোট খুব ধীর গতিতে একটু একটু করে এগোচ্ছিল। অর্থাৎ পরবর্তী গুলিবিদ্ধ দেহগুলোকে কিছুটা দূরে দূরে ফেলা হয়েছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল। তারপর বোট ঘুরিয়ে আবার পাথরঘাটায় ফেরত আসি এবং সেখানে থেকে যাওয়া গাড়িগুলোসহ আমি এবং মেজর সাব্বির আমাদের ব্যাটালিয়নে ফেরত আসি আর লে. কর্নেল জিয়াসহ তার দল তাদের গন্তব্যে চলে যায়। এরকম যে অভিযান পরিচালিত হলো, এটাকে র্যাবের ভাষায় ‘এলিমিনেশন বা গলফ’ বলা হতো। অর্থাৎ আমার কাছে মনে হয়েছে ধৃত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ট্রেস যেন না থাকে সেই জন্য তাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় এলিমিনেট করে দেওয়া হয়েছে।
লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই ঘটনার প্রায় ২ থেকে ৪ দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মৃতদেহ নদীতে ভেসে ওঠে, এক্ষেত্রে ওই এলাকার স্থানীয় থানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই লাশ ভেসে ওঠার খবর এবং এ ব্যাপারে আরও কী তথ্য পাওয়া যায় তা জানার জন্য র্যাব সদর দপ্তরের ইন্ট. উইং থেকে লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন। মেজর সাব্বির তখন ব্যাটালিয়নের নিজস্ব গোয়েন্দা এবং ওখানকার স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় যথাসম্ভব খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঐ ভেসে উঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ঐ মৃতদেহটির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে ঐ লাশটি নজরুলের। এরকম পরিস্থিতিতে আমার কাছেও মনে হয়েছে, ২ থেকে ৪ দিন আগে পাথরঘাটায় গিয়ে যে তথাকথিত গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেটি একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যা ওই ৩-৪ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যার একজন ছিলেন নজরুল। সার্বিকভাবে বলতে চাই যে, ঊর্ধ্বতন দপ্তর হিসেবে ইন্ট. উইং কমান্ড চ্যানেল ব্রেক করে প্রায়শই ব্যাটালিয়নের তার নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের জনবল এবং ব্যাটালিয়নের অফিসারদেরকে বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দেশ দিতেন, যা আমার অপছন্দনীয় ছিল।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি এখানে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি সেগুলোর জন্য বোট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একটি বোটের মূল মাঝিসহ আরও প্রায় ২-৩ জন সহকারী থাকতো। যেহেতু বোটে করে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হতো আবার তাদেরই লাশ ফেরত আনা হতো সেক্ষেত্রে একটা বিশেষ নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনাটি হলো, একই সোর্স বা সাহায্যকারীকে লম্বা সময় ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনাটি বিশেষ করে অধিনায়ক সম্মেলনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া বলতেন। এই প্রসঙ্গে বলি, বরিশালে এসে বোট ব্যবহার করে যে অভিযানগুলো ইন্টেলিজেন্স উইং করেছিল সেখানে একজন মাঝির বোট অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছিল। ঐ মাঝির নাম ছিল আলকাস। এই আলকাস মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল জানিয়ে লে. কর্নেল জিয়া মেজর সাব্বিরকে অবহিত করেন। যেহেতু ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাদের এ সংক্রান্তে সরঞ্জামাদি যথেষ্ট ছিল তাই পাথরঘাটা তথা আলকাস মাঝির অবস্থান এলাকায় যেসব গোপন খবর প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিল তা ইন্টেলিজেন্স উইং খুব দ্রুতই সংগ্রহ করতে পারতো। এরপর বেশ কিছুদিন আর আলকাস মাঝির বোট ব্যবহার করা হয়নি। তবে এক সময় লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন যে, আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে হবে, আর তুমি এটা করবে। এরপর মেজর সাব্বির আমাকে জানায় যে, সে লে. কর্নেল জিয়ার কাছ থেকে আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করার যে নির্দেশ পেয়েছিল সেটি সে পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এই ঘটনার কয়েকদিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আসে এবং জানায় যে, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা র্যাব-৮ হিসেবে তার কোনো খবর জানি কি না। আমরা ঐ পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেই এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু সাহায্য সহযোগিতাও করি। আলকাস মাঝির এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে আমার নিশ্চিত সন্দেহ হয়েছে যে, যেহেতু মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবার এই মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে তাই তাকে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বেই নিখোঁজ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এ পর্যন্ত আমি আমার বক্তব্যে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি তার সবগুলোই অযাচিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা অন্যায়ভাবে করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি। সূত্র: এনটিভি

গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক। সাক্ষ্যতে তিনি বরিশালের পাথরঘাটায় এক অভিযানে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদস্য নজরুলসহ কয়েকজনকে হত্যা করে বস্তায় বেঁধে পেট কটে লাশ নদীতে ফেলার বর্ণনা তুলে ধরেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান ও নাজনীন আহসান।
বেলা সাড়ে ১০টার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য প্রদান করেন। অপরদিকে আসামি জিয়াউল আহসান এজলাস কক্ষের কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দি শোনেন ও নোট করেন।
জবানবন্দির শুরুতে বাহিনীতে নিজের যোগদানের বর্ণনা তুলে ধরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৬২ বৎসর। বর্তমানে আমি অবসরে আছি। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে ১৯৯০ সালের ২২শে জুন লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন্ড প্রাপ্ত হই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক অবসরে যাই। চাকরিকালীন সময়ের মধ্যে আমি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালের অধিনায়ক হিসেবে প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম।
জিয়াউল আহসান ও ডাইরেক্টররা নির্দেশনা দিতেন
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি অধিনায়ক থাকাকালীন সময় আমার সঙ্গে উপঅধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর কুতুব এবং মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। আমার চাকরিকালীন সময়ে র্যাব সদর দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে খন্দকার হাসান মাহমুদ এবং মোখলেছুর রহমানকে পেয়েছি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) হিসেবে তৎকালীন কর্নেল গুলজার, কর্নেল রেজা নুর, কর্নেল মিজান, কর্নেল এস এম মতিউর রহমান, কর্নেল জাহাঙ্গীর এবং কর্নেল মজিবুর রহমান কর্মরত ছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে প্রতি মাসে র্যাব সদর দপ্তরে সিও’স কনফারেন্সে আমাকে যোগ দিতে হতো। সেই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করতেন র্যাবের মহাপরিচালক। সেখানে র্যাবের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। সেই কনফারেন্সে র্যাবের অপারেশন এবং প্রশাসনিক বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সেখানেই র্যাব সদরদপ্তরের সব শাখা প্রধানদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যার মধ্যে ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান, মিডিয়া উইংয়ের ডাইরেক্টর কমান্ডার সোহায়েলসহ অন্যান্য সকল পরিচালক বা ডাইরেক্টররা দিক-নির্দেশনা দিতেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই অধিনায়ক সম্মেলনে যেহেতু দিক নির্দেশনা বা গাইডলাইন দেওয়া হতো তার প্রেক্ষিতে র্যাব ব্যাটালিয়নের অধিনায়করা তাদের নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় দাগী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং তাদেরকে আইনের আওতায় সোপর্দ করার বিষয়ে দিক নির্দেশনা চাইতো। এর প্রেক্ষিতে অধিনায়কদের কাছ থেকে এই মর্মে নির্দেশনা চাওয়া হতো যে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়তো, এক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতেন ধৃত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাবে যোগদান করার পর জানতে পারি র্যাবের কর্মপরিধি হলো সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যান্য কাজের সাথে আমরা দেশব্যাপি টহল ডিউটি সম্পাদন করতাম। সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে যখন কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের জন্য যাওয়া হতো তখন অবশ্যই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোথাও অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান বা মাদক চোরাচালানের ম্যাসেজ আমরা পেতাম তখন গোপনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো।
গোপনীয়তার সাথে এসব অভিযান পরিচালনার সময় টার্গেট এরিয়াতে যদি টার্গেটেড সন্ত্রাসীর মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটতো। আর যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না হতো সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অপারেশন বা অভিযান সফল হতো।
র্যাব-৮ এর আওতায় ছিল ১১টি জেলা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাব-৮ এর আওতায় ১১টি জেলা ছিল। যার প্রায় সবগুলো নদী বিধৌত এবং উপকূলীয়। সুন্দরবনসহ এসব উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতির তৎপরতা ছিল অতিমাত্রায়। তাছাড়া রাজবাড়ী জেলার দিকে সন্ত্রাসী তৎপরতাও ছিল। তার সাথে চরমপন্থি তৎপরতাও ছিল। সুন্দরবনের কিছু এলাকা র্যাব-৮ এর দায়িত্বে এবং কিছু এলাকা র্যাব-৬ এর দায়িত্বে ছিল। সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু দমনের জন্য টহল বা অপারেশন পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন সময়ে ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং তাদের সক্ষমতার কারণে ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতো। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ এবং গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার শংকায় ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্যসহ অপারেশন পরিচালনা করতো। এসব অপরাশেন যেকোন ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাতেই পরিচালনা করা হতো। বরিশাল অঞ্চলে এরকম বেশকিছু সংখ্যক অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের অন্যান্য অফিসার ও সাধারণ সদস্যসহ আসতেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, লে. কর্নেল জিয়ার বাড়ি বরিশালে। সে হিসেবে তিনি বরিশালে তার বাড়িতে এলে আমাদের ব্যাটালিয়নে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আসতেন। তাছাড়া বিভিন্ন অফিসিয়াল ভিজিটে যেমন, মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট হলেও লে. কর্নেল জিয়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
ভোলার অপারেশনে টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সঙ্গে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরও অন্যান্য অফিসার যখন বরিশালে এসে অপারেশন পরিচালনা করতো তখন র্যাব-৮ এর কাছ থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতো। এসব প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে ছিল তাদের জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা, ভারী বস্তার ব্যবস্থা করা, পাথরঘাটাতে বোট ঠিক করে রাখা ইত্যাদি। এরকম অন্তত তিনটা অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে। যার একটি ভোলাতে এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়।
ব্রি. জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, ভোলার অপারেশনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে আমার এবং আমার উপ-অধিনায়ক মেজর সাব্বিরকে যেতে হয়েছিল। সেখানে সফলতা হিসেবে অপারেশন শেষে দুজন ডাকাত বা সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়, সেই সাথে কিছু অস্ত্র। পরবর্তীতে পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর ঐ মৃতদেহগুলোকে ভোলার সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং জিয়ার নেতৃত্বে ভোলাতে ফেরত আসে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমি যা দেখেছি তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে পুরো ঘটনাটি সাজানো অর্থাৎ ঐ সন্ত্রাসী বা ডাকাত দুজনকে আগে থেকেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দুটি স্থির আলোকচিত্র আমি ট্রাইবুনালে দাখিল করলাম।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই সেই দুটি আলোকচিত্র। এই দুটো ছবিতে আমি, জিয়াউল আহসান, তার রানার ইমরুল, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরেকজন অফিসার, জিয়ার পিছনে এএসপি মাহমুদকে দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনের অন্য দুটি অপারেশনের একটি ছিল কুখ্যাত রাজু ডাকাত ধরার জন্য পরিচালিত। যেখানে র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল মুজিব, মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহায়েলসহ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক সাংবাদিক ছিলেন। ঐ অভিযানে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানও ছিলেন। এই অপারেশনের বিষয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়াতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছিল এবং ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। যদিও এটি রাজু ডাকাতকে ধরার পরিকল্পিত অপারেশন ছিল তবে রাজু ডাকাতকে সেখানে পাওয়া যায়নি, বরং ২ থেকে ৩টি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এই অপারেশনটিও যথাযথ পুলিশি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। সুন্দরবনের অপর অপারেশনটি ছিল নিশানখালি এলাকায়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক অপারেশন। এই অপারেশনেও ইতোপূর্বে বর্ণিত অফিসারবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন এবং এটিও ছিল একটি যৌথ অপারেশন। এখানেও ২ থেকে ৩টি মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। উল্লেখিত দুটি অপারেশনের ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এ দুটি ক্ষেত্রেও আমার কাছে মনে হয়েছে টার্গেট এলাকায় মৃত ডাকাতদের আগে থেকেই গুলি করে মারা হয়েছে।
র্যাবে ‘এলিমিনেশন বা গলফ’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি আগেই বলেছি যেহেতু বরিশাল অঞ্চলটি উপকূলীয় এবং ওখানকার নদীগুলো জোয়ার ভাটায় পরিপূর্ণ, এটাকে ব্যবহার করে আরও একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যার কথা আমার মনে আছে। অপারেশনটি সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের। ওই দিন লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের বেশ কয়েকজন অফিসারসহ, যার মধ্যে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট সাইফও ছিল, তাকে আমার বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ হলো তার বিশেষ ধরণের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি এবং লম্বা চুল ছিল। ওই দিন রাতের প্রথম অংশে ২-৩টি মাইক্রোবাস আমাদের ব্যাটালিয়নে প্রবেশ করে, যার নেতৃত্বে ছিল ইন্টেলিজেন্স উইং। পরবর্তীতে আমার ব্যাটালিয়নের অফিসার আমাকে জানায় যে, ঐ মাইক্রোবাসে ৩ থেকে ৪টি সাবজেক্ট আছে। সাবজেক্ট বলতে চোখ ও হাত বাঁধা সাধারণ মানুষ বুঝিয়েছি। আমাকে আরও জানানো হয়, এই মাইক্রোবাসগুলোসহ ইন্টেলিজেন্স উইং পাথরঘাটা এলাকায় যাবে এবং এর জন্য প্রশাসনিক সহায়তা হিসেবে পাথরঘাটায় বোট রেডি করা, পথে নির্বিঘ্নে ফেরিঘাট পার হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। হায়ার হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটালিয়নের এসব নিশ্চিত করতে হতো। যেহেতু ঊর্ধ্বতন দপ্তরের নির্দেশনা মানার বিষয়ে কোনো ধরনের অপারগতা প্রকাশের সুযোগ ছিল না, তাই এসব কাজ ব্যাটালিয়নের করতে হতো। ঠিক একইভাবে এই অভিযানে আমাকে এবং আমার উপ-অধিনায়ককেও তাদের সাথে যেতে হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, মধ্যরাতের পর পাথরঘাটার উদ্দেশে রওনা দিয়ে সেখানে পৌঁছার পর আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বোটে মাইক্রোবাসে থাকা হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিদেরকে উঠানো হয়। তাদেরকে উঠানো হয়ে গেলে লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সাথে আসা অফিসাররাসহ আমি ও মেজর সাব্বির নৌকায় উঠি এবং নৌকার ছাদের উপর গিয়ে বসি। তারপর নৌকা বা বোট পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ঐ দিন আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে না থাকায় মোহনার দিকে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় বোট মোহনার দিকে চলার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। ঐ সময় বোটের ছাদ থেকে লে. কর্নেল জিয়া, ফ্লাইট লে. সাইফ, মেজর সাব্বিরসহ অন্যান্য অফিসাররা নেমে যায়। আমি ছাদের উপরেই ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি বোটের ছাদের সামনের দিকে এসে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করি ওখানে কি হচ্ছে। আমি দেখতে পাই, চোখ-হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সাথে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছিল। বাঁধা হয়ে গেলে একজন ঐ চোখ ও হাত বাঁধা লোককে গুলি করে এবং প্রায় সাথেসাথেই অন্য একজন গুলিবিদ্ধ লোকের পেট ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে। এর পরপরই ঐ গুলিবিদ্ধ লোককে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব দেখে আমি আবার ছাদের পিছন দিকে চলে আসি। সেখানে থেকে আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আরও ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং পানিতে আগের মতোই গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পাই। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথম গুলিবিদ্ধ দেহটি ফেলে দেওয়ার পর বোট খুব ধীর গতিতে একটু একটু করে এগোচ্ছিল। অর্থাৎ পরবর্তী গুলিবিদ্ধ দেহগুলোকে কিছুটা দূরে দূরে ফেলা হয়েছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল। তারপর বোট ঘুরিয়ে আবার পাথরঘাটায় ফেরত আসি এবং সেখানে থেকে যাওয়া গাড়িগুলোসহ আমি এবং মেজর সাব্বির আমাদের ব্যাটালিয়নে ফেরত আসি আর লে. কর্নেল জিয়াসহ তার দল তাদের গন্তব্যে চলে যায়। এরকম যে অভিযান পরিচালিত হলো, এটাকে র্যাবের ভাষায় ‘এলিমিনেশন বা গলফ’ বলা হতো। অর্থাৎ আমার কাছে মনে হয়েছে ধৃত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ট্রেস যেন না থাকে সেই জন্য তাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় এলিমিনেট করে দেওয়া হয়েছে।
লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই ঘটনার প্রায় ২ থেকে ৪ দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মৃতদেহ নদীতে ভেসে ওঠে, এক্ষেত্রে ওই এলাকার স্থানীয় থানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই লাশ ভেসে ওঠার খবর এবং এ ব্যাপারে আরও কী তথ্য পাওয়া যায় তা জানার জন্য র্যাব সদর দপ্তরের ইন্ট. উইং থেকে লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন। মেজর সাব্বির তখন ব্যাটালিয়নের নিজস্ব গোয়েন্দা এবং ওখানকার স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় যথাসম্ভব খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঐ ভেসে উঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ঐ মৃতদেহটির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে ঐ লাশটি নজরুলের। এরকম পরিস্থিতিতে আমার কাছেও মনে হয়েছে, ২ থেকে ৪ দিন আগে পাথরঘাটায় গিয়ে যে তথাকথিত গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেটি একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যা ওই ৩-৪ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যার একজন ছিলেন নজরুল। সার্বিকভাবে বলতে চাই যে, ঊর্ধ্বতন দপ্তর হিসেবে ইন্ট. উইং কমান্ড চ্যানেল ব্রেক করে প্রায়শই ব্যাটালিয়নের তার নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের জনবল এবং ব্যাটালিয়নের অফিসারদেরকে বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দেশ দিতেন, যা আমার অপছন্দনীয় ছিল।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি এখানে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি সেগুলোর জন্য বোট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একটি বোটের মূল মাঝিসহ আরও প্রায় ২-৩ জন সহকারী থাকতো। যেহেতু বোটে করে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হতো আবার তাদেরই লাশ ফেরত আনা হতো সেক্ষেত্রে একটা বিশেষ নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনাটি হলো, একই সোর্স বা সাহায্যকারীকে লম্বা সময় ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনাটি বিশেষ করে অধিনায়ক সম্মেলনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া বলতেন। এই প্রসঙ্গে বলি, বরিশালে এসে বোট ব্যবহার করে যে অভিযানগুলো ইন্টেলিজেন্স উইং করেছিল সেখানে একজন মাঝির বোট অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছিল। ঐ মাঝির নাম ছিল আলকাস। এই আলকাস মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল জানিয়ে লে. কর্নেল জিয়া মেজর সাব্বিরকে অবহিত করেন। যেহেতু ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাদের এ সংক্রান্তে সরঞ্জামাদি যথেষ্ট ছিল তাই পাথরঘাটা তথা আলকাস মাঝির অবস্থান এলাকায় যেসব গোপন খবর প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিল তা ইন্টেলিজেন্স উইং খুব দ্রুতই সংগ্রহ করতে পারতো। এরপর বেশ কিছুদিন আর আলকাস মাঝির বোট ব্যবহার করা হয়নি। তবে এক সময় লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন যে, আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে হবে, আর তুমি এটা করবে। এরপর মেজর সাব্বির আমাকে জানায় যে, সে লে. কর্নেল জিয়ার কাছ থেকে আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করার যে নির্দেশ পেয়েছিল সেটি সে পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এই ঘটনার কয়েকদিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আসে এবং জানায় যে, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা র্যাব-৮ হিসেবে তার কোনো খবর জানি কি না। আমরা ঐ পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেই এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু সাহায্য সহযোগিতাও করি। আলকাস মাঝির এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে আমার নিশ্চিত সন্দেহ হয়েছে যে, যেহেতু মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবার এই মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে তাই তাকে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বেই নিখোঁজ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এ পর্যন্ত আমি আমার বক্তব্যে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি তার সবগুলোই অযাচিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা অন্যায়ভাবে করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি। সূত্র: এনটিভি
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হকের জবানবন্দি

গুম ও হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক। সাক্ষ্যতে তিনি বরিশালের পাথরঘাটায় এক অভিযানে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদস্য নজরুলসহ কয়েকজনকে হত্যা করে বস্তায় বেঁধে পেট কটে লাশ নদীতে ফেলার বর্ণনা তুলে ধরেন।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী, আব্দুস সাত্তার পালোয়ান উপস্থিত ছিলেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাইদুর রহমান ও নাজনীন আহসান।
বেলা সাড়ে ১০টার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক কাঠগড়ায় বসে সাক্ষ্য প্রদান করেন। অপরদিকে আসামি জিয়াউল আহসান এজলাস কক্ষের কাঁচের দেয়ালে ঘেরা কাঠগড়ায় চেয়ারে বসে নিজের বিরুদ্ধে দেওয়া জবানবন্দি শোনেন ও নোট করেন।
জবানবন্দির শুরুতে বাহিনীতে নিজের যোগদানের বর্ণনা তুলে ধরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৬২ বৎসর। বর্তমানে আমি অবসরে আছি। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোর অব ইঞ্জিনিয়ার্সে ১৯৯০ সালের ২২শে জুন লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন্ড প্রাপ্ত হই। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক অবসরে যাই। চাকরিকালীন সময়ের মধ্যে আমি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালের অধিনায়ক হিসেবে প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম।
জিয়াউল আহসান ও ডাইরেক্টররা নির্দেশনা দিতেন
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি অধিনায়ক থাকাকালীন সময় আমার সঙ্গে উপঅধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর কুতুব এবং মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। আমার চাকরিকালীন সময়ে র্যাব সদর দপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে খন্দকার হাসান মাহমুদ এবং মোখলেছুর রহমানকে পেয়েছি। অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) হিসেবে তৎকালীন কর্নেল গুলজার, কর্নেল রেজা নুর, কর্নেল মিজান, কর্নেল এস এম মতিউর রহমান, কর্নেল জাহাঙ্গীর এবং কর্নেল মজিবুর রহমান কর্মরত ছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে প্রতি মাসে র্যাব সদর দপ্তরে সিও’স কনফারেন্সে আমাকে যোগ দিতে হতো। সেই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করতেন র্যাবের মহাপরিচালক। সেখানে র্যাবের সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। সেই কনফারেন্সে র্যাবের অপারেশন এবং প্রশাসনিক বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। সেখানেই র্যাব সদরদপ্তরের সব শাখা প্রধানদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। যার মধ্যে ডাইরেক্টর (ইন্টেলিজেন্স) লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান, মিডিয়া উইংয়ের ডাইরেক্টর কমান্ডার সোহায়েলসহ অন্যান্য সকল পরিচালক বা ডাইরেক্টররা দিক-নির্দেশনা দিতেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই অধিনায়ক সম্মেলনে যেহেতু দিক নির্দেশনা বা গাইডলাইন দেওয়া হতো তার প্রেক্ষিতে র্যাব ব্যাটালিয়নের অধিনায়করা তাদের নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় দাগী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার এবং তাদেরকে আইনের আওতায় সোপর্দ করার বিষয়ে দিক নির্দেশনা চাইতো। এর প্রেক্ষিতে অধিনায়কদের কাছ থেকে এই মর্মে নির্দেশনা চাওয়া হতো যে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়তো, এক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলতেন ধৃত অপরাধীদের ক্ষেত্রে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাবে যোগদান করার পর জানতে পারি র্যাবের কর্মপরিধি হলো সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ। এসব কাজ সম্পাদনের জন্য অন্যান্য কাজের সাথে আমরা দেশব্যাপি টহল ডিউটি সম্পাদন করতাম। সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে যখন কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের জন্য যাওয়া হতো তখন অবশ্যই গোপনীয়তা অবলম্বন করা হতো। একইভাবে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কোথাও অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান বা মাদক চোরাচালানের ম্যাসেজ আমরা পেতাম তখন গোপনীয়তার সাথে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হতো।
গোপনীয়তার সাথে এসব অভিযান পরিচালনার সময় টার্গেট এরিয়াতে যদি টার্গেটেড সন্ত্রাসীর মাধ্যমে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সেখানে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটতো। আর যদি কোনো প্রতিবন্ধকতা না হতো সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অপারেশন বা অভিযান সফল হতো।
র্যাব-৮ এর আওতায় ছিল ১১টি জেলা
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, র্যাব-৮ এর আওতায় ১১টি জেলা ছিল। যার প্রায় সবগুলো নদী বিধৌত এবং উপকূলীয়। সুন্দরবনসহ এসব উপকূলীয় এলাকায় ডাকাতির তৎপরতা ছিল অতিমাত্রায়। তাছাড়া রাজবাড়ী জেলার দিকে সন্ত্রাসী তৎপরতাও ছিল। তার সাথে চরমপন্থি তৎপরতাও ছিল। সুন্দরবনের কিছু এলাকা র্যাব-৮ এর দায়িত্বে এবং কিছু এলাকা র্যাব-৬ এর দায়িত্বে ছিল। সুন্দরবন এলাকায় জলদস্যু দমনের জন্য টহল বা অপারেশন পরিচালনা করা হতো। তৎকালীন সময়ে ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না যার মাধ্যমে সন্ত্রাসী বা ডাকাতদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং তাদের সক্ষমতার কারণে ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতো। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ এবং গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার শংকায় ইন্টেলিজেন্স উইং সরাসরি প্রয়োজনীয় তথ্যসহ অপারেশন পরিচালনা করতো। এসব অপরাশেন যেকোন ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাতেই পরিচালনা করা হতো। বরিশাল অঞ্চলে এরকম বেশকিছু সংখ্যক অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে, যেখানে পরিচালক (ইন্টেলিজেন্স উইং) লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের অন্যান্য অফিসার ও সাধারণ সদস্যসহ আসতেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, লে. কর্নেল জিয়ার বাড়ি বরিশালে। সে হিসেবে তিনি বরিশালে তার বাড়িতে এলে আমাদের ব্যাটালিয়নে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আসতেন। তাছাড়া বিভিন্ন অফিসিয়াল ভিজিটে যেমন, মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট, অতিরিক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের ভিজিট হলেও লে. কর্নেল জিয়া সেখানে উপস্থিত থাকতেন।
ভোলার অপারেশনে টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা
জবানবন্দিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সঙ্গে আসা ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরও অন্যান্য অফিসার যখন বরিশালে এসে অপারেশন পরিচালনা করতো তখন র্যাব-৮ এর কাছ থেকে প্রশাসনিক সহায়তা নিতো। এসব প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে ছিল তাদের জন্য খাবার দাবারের ব্যবস্থা, ভারী বস্তার ব্যবস্থা করা, পাথরঘাটাতে বোট ঠিক করে রাখা ইত্যাদি। এরকম অন্তত তিনটা অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে। যার একটি ভোলাতে এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়।
ব্রি. জেনারেল (অব.) মনিরুল হক বলেন, ভোলার অপারেশনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের সঙ্গে আমার এবং আমার উপ-অধিনায়ক মেজর সাব্বিরকে যেতে হয়েছিল। সেখানে সফলতা হিসেবে অপারেশন শেষে দুজন ডাকাত বা সন্ত্রাসীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার হয়, সেই সাথে কিছু অস্ত্র। পরবর্তীতে পুলিশি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর ঐ মৃতদেহগুলোকে ভোলার সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং জিয়ার নেতৃত্বে ভোলাতে ফেরত আসে। কিন্তু সার্বিকভাবে আমি যা দেখেছি তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে পুরো ঘটনাটি সাজানো অর্থাৎ ঐ সন্ত্রাসী বা ডাকাত দুজনকে আগে থেকেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে দুটি স্থির আলোকচিত্র আমি ট্রাইবুনালে দাখিল করলাম।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই সেই দুটি আলোকচিত্র। এই দুটো ছবিতে আমি, জিয়াউল আহসান, তার রানার ইমরুল, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের আরেকজন অফিসার, জিয়ার পিছনে এএসপি মাহমুদকে দেখা যাচ্ছে। সুন্দরবনের অন্য দুটি অপারেশনের একটি ছিল কুখ্যাত রাজু ডাকাত ধরার জন্য পরিচালিত। যেখানে র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল মুজিব, মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহায়েলসহ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক সাংবাদিক ছিলেন। ঐ অভিযানে ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানও ছিলেন। এই অপারেশনের বিষয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়াতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছিল এবং ভিডিও চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল। যদিও এটি রাজু ডাকাতকে ধরার পরিকল্পিত অপারেশন ছিল তবে রাজু ডাকাতকে সেখানে পাওয়া যায়নি, বরং ২ থেকে ৩টি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়। এই অপারেশনটিও যথাযথ পুলিশি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। সুন্দরবনের অপর অপারেশনটি ছিল নিশানখালি এলাকায়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক অপারেশন। এই অপারেশনেও ইতোপূর্বে বর্ণিত অফিসারবৃন্দ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন এবং এটিও ছিল একটি যৌথ অপারেশন। এখানেও ২ থেকে ৩টি মৃতদেহসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। উল্লেখিত দুটি অপারেশনের ক্ষেত্রেই নিহত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে এ দুটি ক্ষেত্রেও আমার কাছে মনে হয়েছে টার্গেট এলাকায় মৃত ডাকাতদের আগে থেকেই গুলি করে মারা হয়েছে।
র্যাবে ‘এলিমিনেশন বা গলফ’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি আগেই বলেছি যেহেতু বরিশাল অঞ্চলটি উপকূলীয় এবং ওখানকার নদীগুলো জোয়ার ভাটায় পরিপূর্ণ, এটাকে ব্যবহার করে আরও একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, যার কথা আমার মনে আছে। অপারেশনটি সম্ভবত ২০১০ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের। ওই দিন লে. কর্নেল জিয়া এবং তার উইংয়ের বেশ কয়েকজন অফিসারসহ, যার মধ্যে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট সাইফও ছিল, তাকে আমার বিশেষভাবে মনে থাকার কারণ হলো তার বিশেষ ধরণের ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি এবং লম্বা চুল ছিল। ওই দিন রাতের প্রথম অংশে ২-৩টি মাইক্রোবাস আমাদের ব্যাটালিয়নে প্রবেশ করে, যার নেতৃত্বে ছিল ইন্টেলিজেন্স উইং। পরবর্তীতে আমার ব্যাটালিয়নের অফিসার আমাকে জানায় যে, ঐ মাইক্রোবাসে ৩ থেকে ৪টি সাবজেক্ট আছে। সাবজেক্ট বলতে চোখ ও হাত বাঁধা সাধারণ মানুষ বুঝিয়েছি। আমাকে আরও জানানো হয়, এই মাইক্রোবাসগুলোসহ ইন্টেলিজেন্স উইং পাথরঘাটা এলাকায় যাবে এবং এর জন্য প্রশাসনিক সহায়তা হিসেবে পাথরঘাটায় বোট রেডি করা, পথে নির্বিঘ্নে ফেরিঘাট পার হওয়া নিশ্চিত করতে হবে। হায়ার হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটালিয়নের এসব নিশ্চিত করতে হতো। যেহেতু ঊর্ধ্বতন দপ্তরের নির্দেশনা মানার বিষয়ে কোনো ধরনের অপারগতা প্রকাশের সুযোগ ছিল না, তাই এসব কাজ ব্যাটালিয়নের করতে হতো। ঠিক একইভাবে এই অভিযানে আমাকে এবং আমার উপ-অধিনায়ককেও তাদের সাথে যেতে হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, মধ্যরাতের পর পাথরঘাটার উদ্দেশে রওনা দিয়ে সেখানে পৌঁছার পর আগে থেকেই ঠিক করে রাখা বোটে মাইক্রোবাসে থাকা হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিদেরকে উঠানো হয়। তাদেরকে উঠানো হয়ে গেলে লে. কর্নেল জিয়া এবং তার সাথে আসা অফিসাররাসহ আমি ও মেজর সাব্বির নৌকায় উঠি এবং নৌকার ছাদের উপর গিয়ে বসি। তারপর নৌকা বা বোট পাথরঘাটার চরদুয়ানি ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ঐ দিন আবহাওয়া সম্পূর্ণ অনুকূলে না থাকায় মোহনার দিকে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। এক ঘণ্টার কিছু কম সময় বোট মোহনার দিকে চলার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হয়। ঐ সময় বোটের ছাদ থেকে লে. কর্নেল জিয়া, ফ্লাইট লে. সাইফ, মেজর সাব্বিরসহ অন্যান্য অফিসাররা নেমে যায়। আমি ছাদের উপরেই ছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমি বোটের ছাদের সামনের দিকে এসে নিচে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করি ওখানে কি হচ্ছে। আমি দেখতে পাই, চোখ-হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তার শরীরের সাথে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছিল। বাঁধা হয়ে গেলে একজন ঐ চোখ ও হাত বাঁধা লোককে গুলি করে এবং প্রায় সাথেসাথেই অন্য একজন গুলিবিদ্ধ লোকের পেট ছুরি দিয়ে কেটে ফেলে। এর পরপরই ঐ গুলিবিদ্ধ লোককে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এসব দেখে আমি আবার ছাদের পিছন দিকে চলে আসি। সেখানে থেকে আমি কিছুক্ষণের মধ্যে আরও ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনতে পাই এবং পানিতে আগের মতোই গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে দেওয়ার মতো শব্দ শুনতে পাই। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রথম গুলিবিদ্ধ দেহটি ফেলে দেওয়ার পর বোট খুব ধীর গতিতে একটু একটু করে এগোচ্ছিল। অর্থাৎ পরবর্তী গুলিবিদ্ধ দেহগুলোকে কিছুটা দূরে দূরে ফেলা হয়েছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছিল। তারপর বোট ঘুরিয়ে আবার পাথরঘাটায় ফেরত আসি এবং সেখানে থেকে যাওয়া গাড়িগুলোসহ আমি এবং মেজর সাব্বির আমাদের ব্যাটালিয়নে ফেরত আসি আর লে. কর্নেল জিয়াসহ তার দল তাদের গন্তব্যে চলে যায়। এরকম যে অভিযান পরিচালিত হলো, এটাকে র্যাবের ভাষায় ‘এলিমিনেশন বা গলফ’ বলা হতো। অর্থাৎ আমার কাছে মনে হয়েছে ধৃত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের ট্রেস যেন না থাকে সেই জন্য তাদেরকে এই প্রক্রিয়ায় এলিমিনেট করে দেওয়া হয়েছে।
লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এই ঘটনার প্রায় ২ থেকে ৪ দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা মৃতদেহ নদীতে ভেসে ওঠে, এক্ষেত্রে ওই এলাকার স্থানীয় থানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই লাশ ভেসে ওঠার খবর এবং এ ব্যাপারে আরও কী তথ্য পাওয়া যায় তা জানার জন্য র্যাব সদর দপ্তরের ইন্ট. উইং থেকে লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন। মেজর সাব্বির তখন ব্যাটালিয়নের নিজস্ব গোয়েন্দা এবং ওখানকার স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় যথাসম্ভব খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ঐ ভেসে উঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ঐ মৃতদেহটির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয় যে ঐ লাশটি নজরুলের। এরকম পরিস্থিতিতে আমার কাছেও মনে হয়েছে, ২ থেকে ৪ দিন আগে পাথরঘাটায় গিয়ে যে তথাকথিত গোপন অভিযান পরিচালিত হয়েছিল সেটি একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা যা ওই ৩-৪ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, যার একজন ছিলেন নজরুল। সার্বিকভাবে বলতে চাই যে, ঊর্ধ্বতন দপ্তর হিসেবে ইন্ট. উইং কমান্ড চ্যানেল ব্রেক করে প্রায়শই ব্যাটালিয়নের তার নিজস্ব ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের জনবল এবং ব্যাটালিয়নের অফিসারদেরকে বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দেশ দিতেন, যা আমার অপছন্দনীয় ছিল।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, আমি এখানে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি সেগুলোর জন্য বোট ব্যবহার করা হয়েছিল এবং একটি বোটের মূল মাঝিসহ আরও প্রায় ২-৩ জন সহকারী থাকতো। যেহেতু বোটে করে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ধরে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হতো আবার তাদেরই লাশ ফেরত আনা হতো সেক্ষেত্রে একটা বিশেষ নির্দেশনা ছিল। নির্দেশনাটি হলো, একই সোর্স বা সাহায্যকারীকে লম্বা সময় ব্যবহার করা যাবে না। এই নির্দেশনাটি বিশেষ করে অধিনায়ক সম্মেলনে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া বলতেন। এই প্রসঙ্গে বলি, বরিশালে এসে বোট ব্যবহার করে যে অভিযানগুলো ইন্টেলিজেন্স উইং করেছিল সেখানে একজন মাঝির বোট অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছিল। ঐ মাঝির নাম ছিল আলকাস। এই আলকাস মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল জানিয়ে লে. কর্নেল জিয়া মেজর সাব্বিরকে অবহিত করেন। যেহেতু ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের গোয়েন্দা তৎপরতা এবং তাদের এ সংক্রান্তে সরঞ্জামাদি যথেষ্ট ছিল তাই পাথরঘাটা তথা আলকাস মাঝির অবস্থান এলাকায় যেসব গোপন খবর প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিল তা ইন্টেলিজেন্স উইং খুব দ্রুতই সংগ্রহ করতে পারতো। এরপর বেশ কিছুদিন আর আলকাস মাঝির বোট ব্যবহার করা হয়নি। তবে এক সময় লে. কর্নেল জিয়া আমার টুআইসি মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন যে, আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে হবে, আর তুমি এটা করবে। এরপর মেজর সাব্বির আমাকে জানায় যে, সে লে. কর্নেল জিয়ার কাছ থেকে আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করার যে নির্দেশ পেয়েছিল সেটি সে পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। এই ঘটনার কয়েকদিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে আসে এবং জানায় যে, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা র্যাব-৮ হিসেবে তার কোনো খবর জানি কি না। আমরা ঐ পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেই এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে কিছু সাহায্য সহযোগিতাও করি। আলকাস মাঝির এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে আমার নিশ্চিত সন্দেহ হয়েছে যে, যেহেতু মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আবার এই মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে তাই তাকে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের দায়িত্বেই নিখোঁজ করা হয়েছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক বলেন, এ পর্যন্ত আমি আমার বক্তব্যে যেসব অভিযান বা অপারেশনের কথা বলেছি তার সবগুলোই অযাচিত বা অনিয়ন্ত্রিত বা অন্যায়ভাবে করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এই আমার জবানবন্দি। সূত্র: এনটিভি
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!