
খ্রিস্টানপ্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি খ্রিস্টান। শহরের কেন্দ্রজুড়ে শুনা যায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এসবের মাঝেও কলম্বিয়ার সমাজে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে মুসলিম সম্প্রদায়।
স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীসহ হিসাব করলে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বৈচিত্র্য
জনসংখ্যায় অল্প হলেও কলম্বিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কেউ অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছেন, কেউ আবার ধর্মান্তরিত মুসলমান।
রমজান শুরুর আগে বোগোতা ও মেডেলিনের মতো শহরগুলোতে আলোকসজ্জা ও ব্যানারের মাধ্যমে মসজিদগুলো সাজানো হয়। মেডেলিনের উপকণ্ঠ বেলেন এলাকার একটি ছোট মসজিদের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা রমজান কারিম।
মসজিদের ইমাম মুতাসিম আবদো জানান, এখানে শুধু কলম্বিয়ানই নন ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আরব দেশের মুসলমানরাও আসেন। চার বছর আগে মিসর থেকে মেডেলিনে আসা এই ইমামের মতে, মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় অল্প হওয়ায় অনেক অভিবাসী নিজ দেশের রমজানের জাঁকজমক মিস করেন।
২৩ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা রানা আরিফ মোহাম্মদও শুরুতে সেই একাকিত্ব অনুভব করেছিলেন। মেডেলিনে বসতি গড়ে তিনি একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন, যেখানে পাকিস্তানি ও আরব খাবার পরিবেশন করা হয়। তখন মুসলমান খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। তার কথায়, আজ মেডেলিনেই অন্তত পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।
বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা
কলম্বিয়ায় মুসলমানদের উপস্থিতি বাড়ছে বিভিন্নভাবে। ২০২০ সালে সীমান্ত শহর মাইকাও-তে দেশটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। লাতিন আমেরিকায় মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে মূলত অটোমান সাম্রাজ্য পতনের পর। কলম্বিয়ায় বড় ঢেউ আসে ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময়। তখন প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ দেশ ছাড়েন, যাদের মধ্যে মুসলমান ও খ্রিস্টান উভয়ই ছিলেন। তাদের অনেকেই মাইকাওতে বসতি গড়েন, যেখানে ১৯৯৭ সালে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ নির্মিত হয়।
বোগোতার পশ্চিমাংশের কুরতুবি ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শায়খ আহমাদ কুরতুবি তার নামাজের জামাতে বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতির কথা জানান। প্রথম তারাবির নামাজ শেষে তিনি বলেন, এখানে ১০ থেকে ১৫টি দেশের মুসলমান একসঙ্গে নামাজ আদায় ও ইবাদত পালন করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, মুসল্লিদের ১০০ থেকে ২০০ জন নতুন মুসলমান।
মুসলিম সমাজে চ্যালেঞ্জ
তবে বৈচিত্র্যের কারণে ঐক্য গড়া সহজ নয়। কুরতুবির ভাষ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইসলাম গ্রহণ করায় একটি স্থায়ী ও সমাজে প্রভাব ফেলতে সক্ষম কমিউনিটি গড়া চ্যালেঞ্জিং। তবু এই বৈচিত্র্যই রমজানকে করে তোলে অনন্য। কলম্বিয়ায় ইফতারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর কিংবা পরিচিত আরব খাবার সচারাচর চোখে পড়ে না, বরং এখানে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে ইফতার আয়োজনে।
ইফতার আয়োজনে ভিন্নতা
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ইফতারের খাবার রান্না করে আনেন। কোথাও মরক্কোর খাবার, কোথাও পাকিস্তানি রান্না, আবার কোথাও খাঁটি কলম্বিয়ান পদ।
শায়খ আহমাদ কুরতুবির মতে, রমজানের মতো আয়োজনই পার্থক্যগুলোকে আপন করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। জ্ঞান ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই একটি সম্প্রদায়কে বিকশিত হতে সাহায্য করে এবং কলম্বিয়ার মাটিতে গভীর শিকড় গাঁথার পথ তৈরি করে।
সিরীয় বংশোদ্ভূত আলেম শায়খ আহমদ তাইয়েল ও তার স্ত্রী ইফতার করেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার আজিয়াকো সান্তাফেরেনো দিয়ে। তিন ধরনের আন্দিজ আলু, মুরগির মাংস, ভুট্টা আর অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপ তাদের জীবনের দুই ভুবনের মধ্যে এক নীরব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
নির্বাসন থেকে কমিউনিটি গড়ার গল্প
১৯৯২ সালে সিরিয়ার তৎকালীন শাসক হাফেজ আল আসাদের সরকারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে স্ত্রীসহ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন শায়খ আহমদ তাইয়েল। তখন বোগোতায় মুসলমানরা একটি ছোট ঘরে নামাজ আদায় করতেন। ইসলামী আইন ও কোরআন বিষয়ে অভিজ্ঞ এই আলেম বিশ্ব ইতিহাস, দর্শন ও কলম্বিয়ার সাহিত্যে গভীর আগ্রহী। প্রতিদিন বই পড়াকে তিনি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মনে করেন।
পনেরো বছর আগে তার নেতৃত্বেই বোগোতার ৮০ নম্বর স্ট্রিটে নির্মিত হয় আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ। ঈদের দিনগুলোতে এখানে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
এই মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে কলম্বিয়ার বৈচিত্র্য স্পষ্ট। প্রায় ৪০ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান। তাদের একজন সিলভিয়া আলাগুনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শূন্যতা আর অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন তিনি ইসলামে।
মসজিদ যেন ঘরের অংশ
মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় বোগোতার ঠান্ডা আবহাওয়া। ইফতারের জন্য রান্না করা ভাত ও মসলার গন্ধে ভরে থাকে পরিবেশ। অতিথিদের জন্য রাখা হয় কলম্বিয়ান কফি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তা উন্মুক্ত। নামাজের সময় মসজিদের পরিবেশ বেশ শৃঙ্খল থাকে, তবে মসজিদের পরিবেশে কোথাও কঠোরতা নেই। শিশুদের কোলাহল, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষার আলাপ সব মিলিয়ে মসজিদ যেন একটি সম্মিলিত পরিবারিক ঘর হয়ে উঠে।
সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুশীলন রমজান
শায়খ তাইয়েলের কাছে রমজান শুধু অনাহারে থাকার মাস নয়, বরং বাস্তব সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চার মোক্ষম সময়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অনুভূতি বোঝার সুযোগ দেয় মাস। তাই যাকাতের অর্থ দিয়ে পথচারী ও প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়, যেনো উৎসবের আনন্দে কেউ অভুক্ত না থাকে।
রমজান এখানে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। গত বছর মসজিদে আয়োজিত ইফতারে ক্যাথলিক, ইহুদি, ইভানজেলিক্যাল ও মরমন ধর্মীয় নেতারা এক ছাদের নিচে বসে একসঙ্গে খাবার খান। বোগোতায় রমজানের সেই সন্ধ্যায় এক বাটি কলম্বিয়ান স্যুপকে কেন্দ্র করে মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

খ্রিস্টানপ্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি খ্রিস্টান। শহরের কেন্দ্রজুড়ে শুনা যায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এসবের মাঝেও কলম্বিয়ার সমাজে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে মুসলিম সম্প্রদায়।
স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীসহ হিসাব করলে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বৈচিত্র্য
জনসংখ্যায় অল্প হলেও কলম্বিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কেউ অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছেন, কেউ আবার ধর্মান্তরিত মুসলমান।
রমজান শুরুর আগে বোগোতা ও মেডেলিনের মতো শহরগুলোতে আলোকসজ্জা ও ব্যানারের মাধ্যমে মসজিদগুলো সাজানো হয়। মেডেলিনের উপকণ্ঠ বেলেন এলাকার একটি ছোট মসজিদের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা রমজান কারিম।
মসজিদের ইমাম মুতাসিম আবদো জানান, এখানে শুধু কলম্বিয়ানই নন ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আরব দেশের মুসলমানরাও আসেন। চার বছর আগে মিসর থেকে মেডেলিনে আসা এই ইমামের মতে, মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় অল্প হওয়ায় অনেক অভিবাসী নিজ দেশের রমজানের জাঁকজমক মিস করেন।
২৩ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা রানা আরিফ মোহাম্মদও শুরুতে সেই একাকিত্ব অনুভব করেছিলেন। মেডেলিনে বসতি গড়ে তিনি একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন, যেখানে পাকিস্তানি ও আরব খাবার পরিবেশন করা হয়। তখন মুসলমান খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। তার কথায়, আজ মেডেলিনেই অন্তত পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।
বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা
কলম্বিয়ায় মুসলমানদের উপস্থিতি বাড়ছে বিভিন্নভাবে। ২০২০ সালে সীমান্ত শহর মাইকাও-তে দেশটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। লাতিন আমেরিকায় মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে মূলত অটোমান সাম্রাজ্য পতনের পর। কলম্বিয়ায় বড় ঢেউ আসে ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময়। তখন প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ দেশ ছাড়েন, যাদের মধ্যে মুসলমান ও খ্রিস্টান উভয়ই ছিলেন। তাদের অনেকেই মাইকাওতে বসতি গড়েন, যেখানে ১৯৯৭ সালে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ নির্মিত হয়।
বোগোতার পশ্চিমাংশের কুরতুবি ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শায়খ আহমাদ কুরতুবি তার নামাজের জামাতে বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতির কথা জানান। প্রথম তারাবির নামাজ শেষে তিনি বলেন, এখানে ১০ থেকে ১৫টি দেশের মুসলমান একসঙ্গে নামাজ আদায় ও ইবাদত পালন করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, মুসল্লিদের ১০০ থেকে ২০০ জন নতুন মুসলমান।
মুসলিম সমাজে চ্যালেঞ্জ
তবে বৈচিত্র্যের কারণে ঐক্য গড়া সহজ নয়। কুরতুবির ভাষ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইসলাম গ্রহণ করায় একটি স্থায়ী ও সমাজে প্রভাব ফেলতে সক্ষম কমিউনিটি গড়া চ্যালেঞ্জিং। তবু এই বৈচিত্র্যই রমজানকে করে তোলে অনন্য। কলম্বিয়ায় ইফতারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর কিংবা পরিচিত আরব খাবার সচারাচর চোখে পড়ে না, বরং এখানে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে ইফতার আয়োজনে।
ইফতার আয়োজনে ভিন্নতা
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ইফতারের খাবার রান্না করে আনেন। কোথাও মরক্কোর খাবার, কোথাও পাকিস্তানি রান্না, আবার কোথাও খাঁটি কলম্বিয়ান পদ।
শায়খ আহমাদ কুরতুবির মতে, রমজানের মতো আয়োজনই পার্থক্যগুলোকে আপন করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। জ্ঞান ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই একটি সম্প্রদায়কে বিকশিত হতে সাহায্য করে এবং কলম্বিয়ার মাটিতে গভীর শিকড় গাঁথার পথ তৈরি করে।
সিরীয় বংশোদ্ভূত আলেম শায়খ আহমদ তাইয়েল ও তার স্ত্রী ইফতার করেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার আজিয়াকো সান্তাফেরেনো দিয়ে। তিন ধরনের আন্দিজ আলু, মুরগির মাংস, ভুট্টা আর অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপ তাদের জীবনের দুই ভুবনের মধ্যে এক নীরব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
নির্বাসন থেকে কমিউনিটি গড়ার গল্প
১৯৯২ সালে সিরিয়ার তৎকালীন শাসক হাফেজ আল আসাদের সরকারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে স্ত্রীসহ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন শায়খ আহমদ তাইয়েল। তখন বোগোতায় মুসলমানরা একটি ছোট ঘরে নামাজ আদায় করতেন। ইসলামী আইন ও কোরআন বিষয়ে অভিজ্ঞ এই আলেম বিশ্ব ইতিহাস, দর্শন ও কলম্বিয়ার সাহিত্যে গভীর আগ্রহী। প্রতিদিন বই পড়াকে তিনি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মনে করেন।
পনেরো বছর আগে তার নেতৃত্বেই বোগোতার ৮০ নম্বর স্ট্রিটে নির্মিত হয় আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ। ঈদের দিনগুলোতে এখানে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
এই মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে কলম্বিয়ার বৈচিত্র্য স্পষ্ট। প্রায় ৪০ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান। তাদের একজন সিলভিয়া আলাগুনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শূন্যতা আর অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন তিনি ইসলামে।
মসজিদ যেন ঘরের অংশ
মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় বোগোতার ঠান্ডা আবহাওয়া। ইফতারের জন্য রান্না করা ভাত ও মসলার গন্ধে ভরে থাকে পরিবেশ। অতিথিদের জন্য রাখা হয় কলম্বিয়ান কফি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তা উন্মুক্ত। নামাজের সময় মসজিদের পরিবেশ বেশ শৃঙ্খল থাকে, তবে মসজিদের পরিবেশে কোথাও কঠোরতা নেই। শিশুদের কোলাহল, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষার আলাপ সব মিলিয়ে মসজিদ যেন একটি সম্মিলিত পরিবারিক ঘর হয়ে উঠে।
সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুশীলন রমজান
শায়খ তাইয়েলের কাছে রমজান শুধু অনাহারে থাকার মাস নয়, বরং বাস্তব সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চার মোক্ষম সময়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অনুভূতি বোঝার সুযোগ দেয় মাস। তাই যাকাতের অর্থ দিয়ে পথচারী ও প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়, যেনো উৎসবের আনন্দে কেউ অভুক্ত না থাকে।
রমজান এখানে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। গত বছর মসজিদে আয়োজিত ইফতারে ক্যাথলিক, ইহুদি, ইভানজেলিক্যাল ও মরমন ধর্মীয় নেতারা এক ছাদের নিচে বসে একসঙ্গে খাবার খান। বোগোতায় রমজানের সেই সন্ধ্যায় এক বাটি কলম্বিয়ান স্যুপকে কেন্দ্র করে মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

খ্রিস্টানপ্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি খ্রিস্টান। শহরের কেন্দ্রজুড়ে শুনা যায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এসবের মাঝেও কলম্বিয়ার সমাজে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে মুসলিম সম্প্রদায়।
স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীসহ হিসাব করলে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বৈচিত্র্য
জনসংখ্যায় অল্প হলেও কলম্বিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কেউ অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছেন, কেউ আবার ধর্মান্তরিত মুসলমান।
রমজান শুরুর আগে বোগোতা ও মেডেলিনের মতো শহরগুলোতে আলোকসজ্জা ও ব্যানারের মাধ্যমে মসজিদগুলো সাজানো হয়। মেডেলিনের উপকণ্ঠ বেলেন এলাকার একটি ছোট মসজিদের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা রমজান কারিম।
মসজিদের ইমাম মুতাসিম আবদো জানান, এখানে শুধু কলম্বিয়ানই নন ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আরব দেশের মুসলমানরাও আসেন। চার বছর আগে মিসর থেকে মেডেলিনে আসা এই ইমামের মতে, মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় অল্প হওয়ায় অনেক অভিবাসী নিজ দেশের রমজানের জাঁকজমক মিস করেন।
২৩ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা রানা আরিফ মোহাম্মদও শুরুতে সেই একাকিত্ব অনুভব করেছিলেন। মেডেলিনে বসতি গড়ে তিনি একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন, যেখানে পাকিস্তানি ও আরব খাবার পরিবেশন করা হয়। তখন মুসলমান খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। তার কথায়, আজ মেডেলিনেই অন্তত পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।
বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা
কলম্বিয়ায় মুসলমানদের উপস্থিতি বাড়ছে বিভিন্নভাবে। ২০২০ সালে সীমান্ত শহর মাইকাও-তে দেশটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। লাতিন আমেরিকায় মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে মূলত অটোমান সাম্রাজ্য পতনের পর। কলম্বিয়ায় বড় ঢেউ আসে ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময়। তখন প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ দেশ ছাড়েন, যাদের মধ্যে মুসলমান ও খ্রিস্টান উভয়ই ছিলেন। তাদের অনেকেই মাইকাওতে বসতি গড়েন, যেখানে ১৯৯৭ সালে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ নির্মিত হয়।
বোগোতার পশ্চিমাংশের কুরতুবি ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শায়খ আহমাদ কুরতুবি তার নামাজের জামাতে বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতির কথা জানান। প্রথম তারাবির নামাজ শেষে তিনি বলেন, এখানে ১০ থেকে ১৫টি দেশের মুসলমান একসঙ্গে নামাজ আদায় ও ইবাদত পালন করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, মুসল্লিদের ১০০ থেকে ২০০ জন নতুন মুসলমান।
মুসলিম সমাজে চ্যালেঞ্জ
তবে বৈচিত্র্যের কারণে ঐক্য গড়া সহজ নয়। কুরতুবির ভাষ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইসলাম গ্রহণ করায় একটি স্থায়ী ও সমাজে প্রভাব ফেলতে সক্ষম কমিউনিটি গড়া চ্যালেঞ্জিং। তবু এই বৈচিত্র্যই রমজানকে করে তোলে অনন্য। কলম্বিয়ায় ইফতারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর কিংবা পরিচিত আরব খাবার সচারাচর চোখে পড়ে না, বরং এখানে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে ইফতার আয়োজনে।
ইফতার আয়োজনে ভিন্নতা
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ইফতারের খাবার রান্না করে আনেন। কোথাও মরক্কোর খাবার, কোথাও পাকিস্তানি রান্না, আবার কোথাও খাঁটি কলম্বিয়ান পদ।
শায়খ আহমাদ কুরতুবির মতে, রমজানের মতো আয়োজনই পার্থক্যগুলোকে আপন করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। জ্ঞান ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই একটি সম্প্রদায়কে বিকশিত হতে সাহায্য করে এবং কলম্বিয়ার মাটিতে গভীর শিকড় গাঁথার পথ তৈরি করে।
সিরীয় বংশোদ্ভূত আলেম শায়খ আহমদ তাইয়েল ও তার স্ত্রী ইফতার করেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার আজিয়াকো সান্তাফেরেনো দিয়ে। তিন ধরনের আন্দিজ আলু, মুরগির মাংস, ভুট্টা আর অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপ তাদের জীবনের দুই ভুবনের মধ্যে এক নীরব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
নির্বাসন থেকে কমিউনিটি গড়ার গল্প
১৯৯২ সালে সিরিয়ার তৎকালীন শাসক হাফেজ আল আসাদের সরকারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে স্ত্রীসহ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন শায়খ আহমদ তাইয়েল। তখন বোগোতায় মুসলমানরা একটি ছোট ঘরে নামাজ আদায় করতেন। ইসলামী আইন ও কোরআন বিষয়ে অভিজ্ঞ এই আলেম বিশ্ব ইতিহাস, দর্শন ও কলম্বিয়ার সাহিত্যে গভীর আগ্রহী। প্রতিদিন বই পড়াকে তিনি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মনে করেন।
পনেরো বছর আগে তার নেতৃত্বেই বোগোতার ৮০ নম্বর স্ট্রিটে নির্মিত হয় আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ। ঈদের দিনগুলোতে এখানে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
এই মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে কলম্বিয়ার বৈচিত্র্য স্পষ্ট। প্রায় ৪০ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান। তাদের একজন সিলভিয়া আলাগুনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শূন্যতা আর অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন তিনি ইসলামে।
মসজিদ যেন ঘরের অংশ
মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় বোগোতার ঠান্ডা আবহাওয়া। ইফতারের জন্য রান্না করা ভাত ও মসলার গন্ধে ভরে থাকে পরিবেশ। অতিথিদের জন্য রাখা হয় কলম্বিয়ান কফি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তা উন্মুক্ত। নামাজের সময় মসজিদের পরিবেশ বেশ শৃঙ্খল থাকে, তবে মসজিদের পরিবেশে কোথাও কঠোরতা নেই। শিশুদের কোলাহল, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষার আলাপ সব মিলিয়ে মসজিদ যেন একটি সম্মিলিত পরিবারিক ঘর হয়ে উঠে।
সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুশীলন রমজান
শায়খ তাইয়েলের কাছে রমজান শুধু অনাহারে থাকার মাস নয়, বরং বাস্তব সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চার মোক্ষম সময়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অনুভূতি বোঝার সুযোগ দেয় মাস। তাই যাকাতের অর্থ দিয়ে পথচারী ও প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়, যেনো উৎসবের আনন্দে কেউ অভুক্ত না থাকে।
রমজান এখানে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। গত বছর মসজিদে আয়োজিত ইফতারে ক্যাথলিক, ইহুদি, ইভানজেলিক্যাল ও মরমন ধর্মীয় নেতারা এক ছাদের নিচে বসে একসঙ্গে খাবার খান। বোগোতায় রমজানের সেই সন্ধ্যায় এক বাটি কলম্বিয়ান স্যুপকে কেন্দ্র করে মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

খ্রিস্টানপ্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বেশি খ্রিস্টান। শহরের কেন্দ্রজুড়ে শুনা যায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। এসবের মাঝেও কলম্বিয়ার সমাজে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে মুসলিম সম্প্রদায়।
স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার বলছে, আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীসহ হিসাব করলে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বৈচিত্র্য
জনসংখ্যায় অল্প হলেও কলম্বিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য। কেউ অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছেন, কেউ আবার ধর্মান্তরিত মুসলমান।
রমজান শুরুর আগে বোগোতা ও মেডেলিনের মতো শহরগুলোতে আলোকসজ্জা ও ব্যানারের মাধ্যমে মসজিদগুলো সাজানো হয়। মেডেলিনের উপকণ্ঠ বেলেন এলাকার একটি ছোট মসজিদের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা রমজান কারিম।
মসজিদের ইমাম মুতাসিম আবদো জানান, এখানে শুধু কলম্বিয়ানই নন ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন আরব দেশের মুসলমানরাও আসেন। চার বছর আগে মিসর থেকে মেডেলিনে আসা এই ইমামের মতে, মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় অল্প হওয়ায় অনেক অভিবাসী নিজ দেশের রমজানের জাঁকজমক মিস করেন।
২৩ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা রানা আরিফ মোহাম্মদও শুরুতে সেই একাকিত্ব অনুভব করেছিলেন। মেডেলিনে বসতি গড়ে তিনি একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন, যেখানে পাকিস্তানি ও আরব খাবার পরিবেশন করা হয়। তখন মুসলমান খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এখন দৃশ্যপট বদলেছে। তার কথায়, আজ মেডেলিনেই অন্তত পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।
বাড়ছে মুসলিম জনসংখ্যা
কলম্বিয়ায় মুসলমানদের উপস্থিতি বাড়ছে বিভিন্নভাবে। ২০২০ সালে সীমান্ত শহর মাইকাও-তে দেশটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। লাতিন আমেরিকায় মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে শুরু করে মূলত অটোমান সাম্রাজ্য পতনের পর। কলম্বিয়ায় বড় ঢেউ আসে ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময়। তখন প্রায় ১০ লাখ লেবানিজ দেশ ছাড়েন, যাদের মধ্যে মুসলমান ও খ্রিস্টান উভয়ই ছিলেন। তাদের অনেকেই মাইকাওতে বসতি গড়েন, যেখানে ১৯৯৭ সালে লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ নির্মিত হয়।
বোগোতার পশ্চিমাংশের কুরতুবি ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শায়খ আহমাদ কুরতুবি তার নামাজের জামাতে বিভিন্ন দেশের মানুষের উপস্থিতির কথা জানান। প্রথম তারাবির নামাজ শেষে তিনি বলেন, এখানে ১০ থেকে ১৫টি দেশের মুসলমান একসঙ্গে নামাজ আদায় ও ইবাদত পালন করেন। তার হিসাব অনুযায়ী, মুসল্লিদের ১০০ থেকে ২০০ জন নতুন মুসলমান।
মুসলিম সমাজে চ্যালেঞ্জ
তবে বৈচিত্র্যের কারণে ঐক্য গড়া সহজ নয়। কুরতুবির ভাষ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইসলাম গ্রহণ করায় একটি স্থায়ী ও সমাজে প্রভাব ফেলতে সক্ষম কমিউনিটি গড়া চ্যালেঞ্জিং। তবু এই বৈচিত্র্যই রমজানকে করে তোলে অনন্য। কলম্বিয়ায় ইফতারে মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর কিংবা পরিচিত আরব খাবার সচারাচর চোখে পড়ে না, বরং এখানে বেশ বৈচিত্র্য রয়েছে ইফতার আয়োজনে।
ইফতার আয়োজনে ভিন্নতা
প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন পরিবার ইফতারের খাবার রান্না করে আনেন। কোথাও মরক্কোর খাবার, কোথাও পাকিস্তানি রান্না, আবার কোথাও খাঁটি কলম্বিয়ান পদ।
শায়খ আহমাদ কুরতুবির মতে, রমজানের মতো আয়োজনই পার্থক্যগুলোকে আপন করে নেওয়ার সুযোগ দেয়। জ্ঞান ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই একটি সম্প্রদায়কে বিকশিত হতে সাহায্য করে এবং কলম্বিয়ার মাটিতে গভীর শিকড় গাঁথার পথ তৈরি করে।
সিরীয় বংশোদ্ভূত আলেম শায়খ আহমদ তাইয়েল ও তার স্ত্রী ইফতার করেন কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার আজিয়াকো সান্তাফেরেনো দিয়ে। তিন ধরনের আন্দিজ আলু, মুরগির মাংস, ভুট্টা আর অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি এই ঘন স্যুপ তাদের জীবনের দুই ভুবনের মধ্যে এক নীরব সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
নির্বাসন থেকে কমিউনিটি গড়ার গল্প
১৯৯২ সালে সিরিয়ার তৎকালীন শাসক হাফেজ আল আসাদের সরকারের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে স্ত্রীসহ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন শায়খ আহমদ তাইয়েল। তখন বোগোতায় মুসলমানরা একটি ছোট ঘরে নামাজ আদায় করতেন। ইসলামী আইন ও কোরআন বিষয়ে অভিজ্ঞ এই আলেম বিশ্ব ইতিহাস, দর্শন ও কলম্বিয়ার সাহিত্যে গভীর আগ্রহী। প্রতিদিন বই পড়াকে তিনি সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মনে করেন।
পনেরো বছর আগে তার নেতৃত্বেই বোগোতার ৮০ নম্বর স্ট্রিটে নির্মিত হয় আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ। ঈদের দিনগুলোতে এখানে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
এই মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে কলম্বিয়ার বৈচিত্র্য স্পষ্ট। প্রায় ৪০ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান। তাদের একজন সিলভিয়া আলাগুনা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শূন্যতা আর অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন তিনি ইসলামে।
মসজিদ যেন ঘরের অংশ
মসজিদের ভেতরে ঢুকলেই বদলে যায় বোগোতার ঠান্ডা আবহাওয়া। ইফতারের জন্য রান্না করা ভাত ও মসলার গন্ধে ভরে থাকে পরিবেশ। অতিথিদের জন্য রাখা হয় কলম্বিয়ান কফি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তা উন্মুক্ত। নামাজের সময় মসজিদের পরিবেশ বেশ শৃঙ্খল থাকে, তবে মসজিদের পরিবেশে কোথাও কঠোরতা নেই। শিশুদের কোলাহল, আরবি ও স্প্যানিশ ভাষার আলাপ সব মিলিয়ে মসজিদ যেন একটি সম্মিলিত পরিবারিক ঘর হয়ে উঠে।
সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুশীলন রমজান
শায়খ তাইয়েলের কাছে রমজান শুধু অনাহারে থাকার মাস নয়, বরং বাস্তব সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চার মোক্ষম সময়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের অনুভূতি বোঝার সুযোগ দেয় মাস। তাই যাকাতের অর্থ দিয়ে পথচারী ও প্রতিবেশীদের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়, যেনো উৎসবের আনন্দে কেউ অভুক্ত না থাকে।
রমজান এখানে ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। গত বছর মসজিদে আয়োজিত ইফতারে ক্যাথলিক, ইহুদি, ইভানজেলিক্যাল ও মরমন ধর্মীয় নেতারা এক ছাদের নিচে বসে একসঙ্গে খাবার খান। বোগোতায় রমজানের সেই সন্ধ্যায় এক বাটি কলম্বিয়ান স্যুপকে কেন্দ্র করে মতাদর্শের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভ্রাতৃত্ব আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!