
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বেশ কিছু পীর-ফকিরের খানকা, দরগাহ ও মাজারে হামলা করা হয়। এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবং কবর থেকে দেহাবশেষ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় যত হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে তার তদন্তেও পুলিশের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। হামলার পর থেকে ওই সব খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হামলার ঘটনা কমে এলেও তা এখনো চলছে। আজকের পত্রিকা রবিবারের (১৯ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও ‘সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ নামে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দুই বছরে দেশের সুফিদের মাজার, দরগাহ, খানকার মতো স্থাপনা এবং ওরস, লালন মেলা, পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে ১৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাজার ও দরগায় ৯৯টি হামলা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর এবং লুটপাট চলেছে। হামলার আগে সংশ্লিষ্ট মাজারে ‘ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড’ চলে বলে প্রচার করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বয়ং একজন ‘পীর’সহ চারজন নিহত হয়েছেন।
আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। কোনো কোনো মাজারে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো আর খুলতে পারেনি তাদের কর্তৃপক্ষ; বরং দেশের অস্থিরতা কমে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পরও মাজারে নতুন হামলার ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দরবার শরিফে ‘পীর’ আবদুর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয়।
নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময় এতসংখ্যক মাজারে আর কখনোই হামলা হয়নি। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।
মাজারসংশ্লিষ্টদের বরাতে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের বাধার মুখে মাজারগুলোর সংস্কার বা পুনরায় চালু করতে পারছেন না তারা। হামলার আতঙ্কে মাজারে দর্শনার্থী কমে নেমেছে শূন্যের কোটায়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে খুব কম। মামলা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ২৪ জেলার মাজার, দরগাহ, খানকা ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলা করা হয়েছে ঢাকা বিভাগের মাজার ও এ-সম্পর্কিত স্থাপনায়। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম। এই বিভাগের পাঁচ জেলায় ২৮টিতে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। সারা দেশের এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩টি মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কেবল একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুমিল্লার ১৩টি মাজারে হামলার মধ্যে মামলা করা হয়েছে মাত্র দুটি। হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামের চার মাজারে হামলার এক মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তমাস বড়ুয়া বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না। ফলে মামলাগুলোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ছে এবং চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার তথ্যমতে, ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.), খাজা বাবার দায়রা শরিফ ও শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়া নামে তিনটি মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ এগুলোর তদন্তই করেনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সৈয়দ কালু শাহের (রহ.) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশের এমন অবহেলার কারণেই দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর, হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ-প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজার সংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদীরা কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় বলতে পারেননি। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে। সেখানে হামলা-ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কবর থেকে নুরুল হকের লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রোগে মৃত্যুর পর মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে ভিত্তি তৈরি করে নুরুল হককে কবর দেওয়া হয়েছিল। নুরুল নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করা এবং তাকে বিশেষভাবে কবর দেওয়া নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছিল। এ হামলার ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি।
প্রতিবেদনের বলা হয়, রাজশাহীর পবার ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে’ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয়। এতে কোনো মামলা করা হয়নি। হামলার পর থেকে খানকা বন্ধ।
পীর আজিজুর রহমান বলেছেন, গত ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল মতিন বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’
আজকের পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের পীর রহিম শাহ ভাণ্ডারির মাজারে হামলা-ভাঙচুরে মামলা করেননি ভুক্তভোগীরা। মামলা করা হয়নি পাবনায় দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামে মাজার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ভয়ে তারা মামলা করতে পারছেন না। পুলিশও তাদের সহযোগিতা করছে না।
ব্যতিক্রম হয়েছে নোয়াখালীর একটি ঘটনায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলা হয়। মাজারের পক্ষ থেকে ৪৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
শঙ্কায় মাজার-খানকাহ বন্ধ:
দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলা হওয়ায় ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই মাজারে দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান আয়োজন হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আক্রান্ত মাজারগুলো আবার চালুও করতে পারছেন না তারা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দফা হামলার শিকার হয় শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার (রহ.) ওরফে দোজা পীরের দরবার (মুর্শিদপুর পীরের দরবার)। এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে মাজারটি। খাদেম মাহমুদান মাসুদ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না। প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি।’
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রামে আক্রান্ত অনেক মাজার ও দরগাহ আবার চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সারা দেশে মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও। দেখা গেছে, এসব মাজারেও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। বৃহস্পতিবার মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী। তাদের মধ্যে মো. আলাউদ্দিন আহম্মেদ নামের একজন ছিলেন। সাভারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আগে সুযোগ পেলেই মাজারে ছুটে আসতেন। তিনি বললেন, ‘মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না। মানুষ আসে না। ভক্ত পাগল-ফকিররা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।’
ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায় হযরত হাজি খাজা শাহবাজ (রহ.) মাজার, রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.) মাজার, আজিমপুরের দায়রা শরিফ, পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি (রহ.) মাজার, গুলিস্তানে গোলাপশাহ্ মাজার, চকবাজারে শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি (রহ.) মাজার এবং মিরপুর-১-এ অবস্থিত হযরত মুসা শাহ (রহ.) মাজারেও আগের চেয়ে অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। আগে এসব মাজারে থাকা দুস্থ মানুষদের দুই বেলা খাবার দেওয়া হলেও এখন কোনো কোনোটিতে খাবার বিতরণ বন্ধ রয়েছে।
সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, মাজারে হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ইন্ধন ছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রতি অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘কারো মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে। বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না। তাই বিচার হতেই হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি জন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বেশ কিছু পীর-ফকিরের খানকা, দরগাহ ও মাজারে হামলা করা হয়। এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবং কবর থেকে দেহাবশেষ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় যত হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে তার তদন্তেও পুলিশের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। হামলার পর থেকে ওই সব খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হামলার ঘটনা কমে এলেও তা এখনো চলছে। আজকের পত্রিকা রবিবারের (১৯ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও ‘সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ নামে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দুই বছরে দেশের সুফিদের মাজার, দরগাহ, খানকার মতো স্থাপনা এবং ওরস, লালন মেলা, পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে ১৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাজার ও দরগায় ৯৯টি হামলা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর এবং লুটপাট চলেছে। হামলার আগে সংশ্লিষ্ট মাজারে ‘ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড’ চলে বলে প্রচার করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বয়ং একজন ‘পীর’সহ চারজন নিহত হয়েছেন।
আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। কোনো কোনো মাজারে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো আর খুলতে পারেনি তাদের কর্তৃপক্ষ; বরং দেশের অস্থিরতা কমে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পরও মাজারে নতুন হামলার ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দরবার শরিফে ‘পীর’ আবদুর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয়।
নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময় এতসংখ্যক মাজারে আর কখনোই হামলা হয়নি। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।
মাজারসংশ্লিষ্টদের বরাতে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের বাধার মুখে মাজারগুলোর সংস্কার বা পুনরায় চালু করতে পারছেন না তারা। হামলার আতঙ্কে মাজারে দর্শনার্থী কমে নেমেছে শূন্যের কোটায়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে খুব কম। মামলা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ২৪ জেলার মাজার, দরগাহ, খানকা ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলা করা হয়েছে ঢাকা বিভাগের মাজার ও এ-সম্পর্কিত স্থাপনায়। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম। এই বিভাগের পাঁচ জেলায় ২৮টিতে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। সারা দেশের এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩টি মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কেবল একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুমিল্লার ১৩টি মাজারে হামলার মধ্যে মামলা করা হয়েছে মাত্র দুটি। হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামের চার মাজারে হামলার এক মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তমাস বড়ুয়া বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না। ফলে মামলাগুলোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ছে এবং চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার তথ্যমতে, ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.), খাজা বাবার দায়রা শরিফ ও শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়া নামে তিনটি মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ এগুলোর তদন্তই করেনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সৈয়দ কালু শাহের (রহ.) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশের এমন অবহেলার কারণেই দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর, হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ-প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজার সংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদীরা কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় বলতে পারেননি। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে। সেখানে হামলা-ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কবর থেকে নুরুল হকের লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রোগে মৃত্যুর পর মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে ভিত্তি তৈরি করে নুরুল হককে কবর দেওয়া হয়েছিল। নুরুল নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করা এবং তাকে বিশেষভাবে কবর দেওয়া নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছিল। এ হামলার ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি।
প্রতিবেদনের বলা হয়, রাজশাহীর পবার ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে’ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয়। এতে কোনো মামলা করা হয়নি। হামলার পর থেকে খানকা বন্ধ।
পীর আজিজুর রহমান বলেছেন, গত ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল মতিন বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’
আজকের পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের পীর রহিম শাহ ভাণ্ডারির মাজারে হামলা-ভাঙচুরে মামলা করেননি ভুক্তভোগীরা। মামলা করা হয়নি পাবনায় দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামে মাজার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ভয়ে তারা মামলা করতে পারছেন না। পুলিশও তাদের সহযোগিতা করছে না।
ব্যতিক্রম হয়েছে নোয়াখালীর একটি ঘটনায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলা হয়। মাজারের পক্ষ থেকে ৪৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
শঙ্কায় মাজার-খানকাহ বন্ধ:
দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলা হওয়ায় ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই মাজারে দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান আয়োজন হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আক্রান্ত মাজারগুলো আবার চালুও করতে পারছেন না তারা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দফা হামলার শিকার হয় শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার (রহ.) ওরফে দোজা পীরের দরবার (মুর্শিদপুর পীরের দরবার)। এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে মাজারটি। খাদেম মাহমুদান মাসুদ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না। প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি।’
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রামে আক্রান্ত অনেক মাজার ও দরগাহ আবার চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সারা দেশে মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও। দেখা গেছে, এসব মাজারেও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। বৃহস্পতিবার মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী। তাদের মধ্যে মো. আলাউদ্দিন আহম্মেদ নামের একজন ছিলেন। সাভারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আগে সুযোগ পেলেই মাজারে ছুটে আসতেন। তিনি বললেন, ‘মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না। মানুষ আসে না। ভক্ত পাগল-ফকিররা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।’
ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায় হযরত হাজি খাজা শাহবাজ (রহ.) মাজার, রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.) মাজার, আজিমপুরের দায়রা শরিফ, পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি (রহ.) মাজার, গুলিস্তানে গোলাপশাহ্ মাজার, চকবাজারে শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি (রহ.) মাজার এবং মিরপুর-১-এ অবস্থিত হযরত মুসা শাহ (রহ.) মাজারেও আগের চেয়ে অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। আগে এসব মাজারে থাকা দুস্থ মানুষদের দুই বেলা খাবার দেওয়া হলেও এখন কোনো কোনোটিতে খাবার বিতরণ বন্ধ রয়েছে।
সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, মাজারে হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ইন্ধন ছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রতি অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘কারো মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে। বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না। তাই বিচার হতেই হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি জন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বেশ কিছু পীর-ফকিরের খানকা, দরগাহ ও মাজারে হামলা করা হয়। এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবং কবর থেকে দেহাবশেষ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় যত হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে তার তদন্তেও পুলিশের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। হামলার পর থেকে ওই সব খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হামলার ঘটনা কমে এলেও তা এখনো চলছে। আজকের পত্রিকা রবিবারের (১৯ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও ‘সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ নামে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দুই বছরে দেশের সুফিদের মাজার, দরগাহ, খানকার মতো স্থাপনা এবং ওরস, লালন মেলা, পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে ১৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাজার ও দরগায় ৯৯টি হামলা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর এবং লুটপাট চলেছে। হামলার আগে সংশ্লিষ্ট মাজারে ‘ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড’ চলে বলে প্রচার করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বয়ং একজন ‘পীর’সহ চারজন নিহত হয়েছেন।
আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। কোনো কোনো মাজারে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো আর খুলতে পারেনি তাদের কর্তৃপক্ষ; বরং দেশের অস্থিরতা কমে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পরও মাজারে নতুন হামলার ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দরবার শরিফে ‘পীর’ আবদুর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয়।
নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময় এতসংখ্যক মাজারে আর কখনোই হামলা হয়নি। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।
মাজারসংশ্লিষ্টদের বরাতে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের বাধার মুখে মাজারগুলোর সংস্কার বা পুনরায় চালু করতে পারছেন না তারা। হামলার আতঙ্কে মাজারে দর্শনার্থী কমে নেমেছে শূন্যের কোটায়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে খুব কম। মামলা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ২৪ জেলার মাজার, দরগাহ, খানকা ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলা করা হয়েছে ঢাকা বিভাগের মাজার ও এ-সম্পর্কিত স্থাপনায়। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম। এই বিভাগের পাঁচ জেলায় ২৮টিতে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। সারা দেশের এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩টি মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কেবল একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুমিল্লার ১৩টি মাজারে হামলার মধ্যে মামলা করা হয়েছে মাত্র দুটি। হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামের চার মাজারে হামলার এক মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তমাস বড়ুয়া বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না। ফলে মামলাগুলোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ছে এবং চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার তথ্যমতে, ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.), খাজা বাবার দায়রা শরিফ ও শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়া নামে তিনটি মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ এগুলোর তদন্তই করেনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সৈয়দ কালু শাহের (রহ.) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশের এমন অবহেলার কারণেই দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর, হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ-প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজার সংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদীরা কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় বলতে পারেননি। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে। সেখানে হামলা-ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কবর থেকে নুরুল হকের লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রোগে মৃত্যুর পর মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে ভিত্তি তৈরি করে নুরুল হককে কবর দেওয়া হয়েছিল। নুরুল নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করা এবং তাকে বিশেষভাবে কবর দেওয়া নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছিল। এ হামলার ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি।
প্রতিবেদনের বলা হয়, রাজশাহীর পবার ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে’ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয়। এতে কোনো মামলা করা হয়নি। হামলার পর থেকে খানকা বন্ধ।
পীর আজিজুর রহমান বলেছেন, গত ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল মতিন বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’
আজকের পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের পীর রহিম শাহ ভাণ্ডারির মাজারে হামলা-ভাঙচুরে মামলা করেননি ভুক্তভোগীরা। মামলা করা হয়নি পাবনায় দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামে মাজার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ভয়ে তারা মামলা করতে পারছেন না। পুলিশও তাদের সহযোগিতা করছে না।
ব্যতিক্রম হয়েছে নোয়াখালীর একটি ঘটনায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলা হয়। মাজারের পক্ষ থেকে ৪৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
শঙ্কায় মাজার-খানকাহ বন্ধ:
দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলা হওয়ায় ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই মাজারে দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান আয়োজন হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আক্রান্ত মাজারগুলো আবার চালুও করতে পারছেন না তারা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দফা হামলার শিকার হয় শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার (রহ.) ওরফে দোজা পীরের দরবার (মুর্শিদপুর পীরের দরবার)। এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে মাজারটি। খাদেম মাহমুদান মাসুদ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না। প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি।’
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রামে আক্রান্ত অনেক মাজার ও দরগাহ আবার চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সারা দেশে মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও। দেখা গেছে, এসব মাজারেও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। বৃহস্পতিবার মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী। তাদের মধ্যে মো. আলাউদ্দিন আহম্মেদ নামের একজন ছিলেন। সাভারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আগে সুযোগ পেলেই মাজারে ছুটে আসতেন। তিনি বললেন, ‘মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না। মানুষ আসে না। ভক্ত পাগল-ফকিররা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।’
ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায় হযরত হাজি খাজা শাহবাজ (রহ.) মাজার, রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.) মাজার, আজিমপুরের দায়রা শরিফ, পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি (রহ.) মাজার, গুলিস্তানে গোলাপশাহ্ মাজার, চকবাজারে শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি (রহ.) মাজার এবং মিরপুর-১-এ অবস্থিত হযরত মুসা শাহ (রহ.) মাজারেও আগের চেয়ে অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। আগে এসব মাজারে থাকা দুস্থ মানুষদের দুই বেলা খাবার দেওয়া হলেও এখন কোনো কোনোটিতে খাবার বিতরণ বন্ধ রয়েছে।
সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, মাজারে হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ইন্ধন ছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রতি অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘কারো মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে। বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না। তাই বিচার হতেই হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি জন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে বেশ কিছু পীর-ফকিরের খানকা, দরগাহ ও মাজারে হামলা করা হয়। এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনা এবং কবর থেকে দেহাবশেষ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের প্রায় পুরোটা সময় যত হামলা হয়েছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি। যে কয়েকটি মামলা করা হয়েছে তার তদন্তেও পুলিশের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়নি। হামলার পর থেকে ওই সব খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হামলার ঘটনা কমে এলেও তা এখনো চলছে। আজকের পত্রিকা রবিবারের (১৯ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও ‘সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’ নামে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত দুই বছরে দেশের সুফিদের মাজার, দরগাহ, খানকার মতো স্থাপনা এবং ওরস, লালন মেলা, পালাগানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনে ১৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মাজার ও দরগায় ৯৯টি হামলা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর এবং লুটপাট চলেছে। হামলার আগে সংশ্লিষ্ট মাজারে ‘ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড’ চলে বলে প্রচার করা হয়েছে। এসব হামলায় স্বয়ং একজন ‘পীর’সহ চারজন নিহত হয়েছেন।
আহত হয়েছেন অন্তত দেড় হাজার মানুষ। কোনো কোনো মাজারে কয়েকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলো আর খুলতে পারেনি তাদের কর্তৃপক্ষ; বরং দেশের অস্থিরতা কমে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার আসার পরও মাজারে নতুন হামলার ঘটনা ঘটছে।
সর্বশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের দরবার শরিফে ‘পীর’ আবদুর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয়।
নিহত শামীমের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছেন। পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময় এতসংখ্যক মাজারে আর কখনোই হামলা হয়নি। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই একের পর এক এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটছে। হামলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।
মাজারসংশ্লিষ্টদের বরাতে আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও স্থানীয়দের বাধার মুখে মাজারগুলোর সংস্কার বা পুনরায় চালু করতে পারছেন না তারা। হামলার আতঙ্কে মাজারে দর্শনার্থী কমে নেমেছে শূন্যের কোটায়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, হামলার ঘটনায় মামলা করা হয়েছে খুব কম। মামলা করা হলেও আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
পুলিশের বিশেষ শাখা ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ২৪ জেলার মাজার, দরগাহ, খানকা ও সংশ্লিষ্ট মতাদর্শের মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলা করা হয়েছে ঢাকা বিভাগের মাজার ও এ-সম্পর্কিত স্থাপনায়। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম। এই বিভাগের পাঁচ জেলায় ২৮টিতে হামলা-ভাঙচুর করা হয়েছে। সারা দেশের এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩টি মামলা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কেবল একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কুমিল্লার ১৩টি মাজারে হামলার মধ্যে মামলা করা হয়েছে মাত্র দুটি। হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামের চার মাজারে হামলার এক মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি নেই।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তমাস বড়ুয়া বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকেই সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না। ফলে মামলাগুলোর অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ছে এবং চার্জশিট দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে।
আজকের পত্রিকার তথ্যমতে, ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.), খাজা বাবার দায়রা শরিফ ও শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়া নামে তিনটি মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনটি মামলা করা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ এগুলোর তদন্তই করেনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সৈয়দ কালু শাহের (রহ.) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ কোনো তদন্ত করেনি বা কোনো আসামিও গ্রেপ্তার করেনি। পুলিশের এমন অবহেলার কারণেই দেশব্যাপী মাজার ভাঙচুর, হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে চলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ-প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মাজার সংশ্লিষ্ট বা মামলার বাদীরা কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় বলতে পারেননি। যে কারণে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাটি হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে। সেখানে হামলা-ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কবর থেকে নুরুল হকের লাশ উঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রোগে মৃত্যুর পর মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উঁচুতে ভিত্তি তৈরি করে নুরুল হককে কবর দেওয়া হয়েছিল। নুরুল নিজেকে ইমাম মেহেদী দাবি করা এবং তাকে বিশেষভাবে কবর দেওয়া নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছিল। এ হামলার ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাসেও তদন্ত শেষ হয়নি।
প্রতিবেদনের বলা হয়, রাজশাহীর পবার ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে’ গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর হামলা হয়। এতে কোনো মামলা করা হয়নি। হামলার পর থেকে খানকা বন্ধ।
পীর আজিজুর রহমান বলেছেন, গত ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করার চেষ্টা করা হলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল মতিন বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’
আজকের পত্রিকার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। দিনাজপুর ঘোড়াঘাটের পীর রহিম শাহ ভাণ্ডারির মাজারে হামলা-ভাঙচুরে মামলা করেননি ভুক্তভোগীরা। মামলা করা হয়নি পাবনায় দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামে মাজার শরিফে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ভয়ে তারা মামলা করতে পারছেন না। পুলিশও তাদের সহযোগিতা করছে না।
ব্যতিক্রম হয়েছে নোয়াখালীর একটি ঘটনায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলা হয়। মাজারের পক্ষ থেকে ৪৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম জানান, ইতিমধ্যে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।
শঙ্কায় মাজার-খানকাহ বন্ধ:
দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলা হওয়ায় ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই মাজারে দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান আয়োজন হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আক্রান্ত মাজারগুলো আবার চালুও করতে পারছেন না তারা।
২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দফা হামলার শিকার হয় শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার (রহ.) ওরফে দোজা পীরের দরবার (মুর্শিদপুর পীরের দরবার)। এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে মাজারটি। খাদেম মাহমুদান মাসুদ গত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না। প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি।’
এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রামে আক্রান্ত অনেক মাজার ও দরগাহ আবার চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সারা দেশে মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও। দেখা গেছে, এসব মাজারেও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। বৃহস্পতিবার মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে গিয়ে দেখা যায়, হাতে গোনা কয়েকজন দর্শনার্থী। তাদের মধ্যে মো. আলাউদ্দিন আহম্মেদ নামের একজন ছিলেন। সাভারের বাসিন্দা আলাউদ্দিন আগে সুযোগ পেলেই মাজারে ছুটে আসতেন। তিনি বললেন, ‘মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না। মানুষ আসে না। ভক্ত পাগল-ফকিররা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।’
ঢাকার হাইকোর্ট এলাকায় হযরত হাজি খাজা শাহবাজ (রহ.) মাজার, রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.) মাজার, আজিমপুরের দায়রা শরিফ, পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি (রহ.) মাজার, গুলিস্তানে গোলাপশাহ্ মাজার, চকবাজারে শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি (রহ.) মাজার এবং মিরপুর-১-এ অবস্থিত হযরত মুসা শাহ (রহ.) মাজারেও আগের চেয়ে অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থী হ্রাস পেয়েছে। আগে এসব মাজারে থাকা দুস্থ মানুষদের দুই বেলা খাবার দেওয়া হলেও এখন কোনো কোনোটিতে খাবার বিতরণ বন্ধ রয়েছে।
সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, মাজারে হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ইন্ধন ছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রতি অবিলম্বে এ ধরনের হামলা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
মাজারে হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ‘কারো মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে। বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না। তাই বিচার হতেই হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি জন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!